Monday, November 3, 2025

আমেরিকান সিটিজেনশিপ দিয়ে আমি কী করব?

 

এই জীবনে বেশির ভাগ কাজই আমি করেছি ঝোঁকের মাথায়। হঠাৎ একটা ইচ্ছে হলো, কোনো দিকে না তাকিয়ে ইচ্ছাটাকে সম্মান দিলাম। পরে যা হবার হবে। দু-একটা উদাহারণ দিইআমাদের সময় সায়েন্সের ছেলেদের ইউনিভার্সিটিতে এসে ইংরেজি বা ইকোনমিকস পড়া ছিল ফ্যাশন। আমিও ফ্যাশনমতো ইকোনমিকসে ভর্তি হয়ে গেলাম। এক বন্ধু পড়বে কেমিস্ট্রি। তাকে নিয়ে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে এসেছি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। কেমিস্ট্রির একজন স্যার হঠাৎ বারান্দায় এলেন। তাকে দেখে আমি মুগ্ধ। কী স্মার্ট, কী সুন্দর চেহারা। তিনি কী মনে করে যেন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করলাম ইকোনমিকস জলে ভেসে যাক। আমি পড়ব কেমিস্ট্রি। ভর্তি হয়ে গেলাম কেমিস্ট্রিতে। ওই স্যারের নাম মাহবুবুল হক। কালিনারায়ণ স্কলার। ভৌত রসায়নের ওস্তাদ লোক। যিনি অঙ্ক করিয়ে করিয়ে পরবর্তী সময়ে আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন।
পিএইচডি করতে গেলাম ভৌত রসায়নে। কোর্স ওয়ার্ক সব শেষ করেছি। দু বছর কেটে গেছে। একদিন বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে সিগারেট টানছি। হঠাৎ লক্ষ করলাম, তিনশ দশ নাম্বার রুমে বুড়ো এক ভদ্রলোক ক্লাস নিতে ঢুকলেন। রোগা লম্বা একজন মানুষ। গায়ে আলখাল্লার মতো কোট। আমার কী যে খেয়াল হলো কে জানে। আমিও ক্লাসে ঢুকলাম। সমস্ত কোর্স শেষ করেছি, আর কোর্স নিতে হবে না। কাজেই এখন নিশ্চিন্ত মনে একটা ক্লাসে ঢোকা যায়।
বুড়ো ভদ্রলোকের নাম জেনো উইকস। পলিমার রসায়ন বিভাগের প্রধান। আমি তাঁর লেকচার শুনে মুগ্ধ। যেমন পড়ানোর ভঙ্গি তেমনই বিষয়বস্তু। দৈত্যাকৃতি অণুর বিচিত্র জগৎ। ক্লাস শেষে আমি তাকে গিয়ে বললাম, আমি আপনার বিভাগে আসতে চাই। ভৌত রসায়নের প্রফেসর সব শুনে খুব রাগ করলেন। আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, তুমি যা করতে যাচ্ছ, খুব বড় ধরনের বোকারাও তা করে না। পিএইচডির কাজ তোমার অনেক দূর এগিয়েছে। কোর্স ওয়ার্ক শেষ করেছ এবং খুব ভালোভাবে করেছ। এখন বিভাগ বদলাতে চাও কেন? মাথা থেকে এসব ঝেড়ে ফেলে দাও।
আমি ঝেড়ে ফেলতে পারলাম না। ঢুকে গেলাম পলিমার রসায়নে। প্রফেসর জেনো উইকস অনেক করলেন। আমাকে ভালো একটা স্কলারশিপ দিলেন। বইপত্র দিয়ে সাহায্য করলেন। কাজ শুরু করলাম পলিমার রসায়নের আর এক জাঁদরেল ব্যক্তি প্রফেসর গ্লাসের সঙ্গে। পলিমারের সব কোর্স যখন নিয়ে শেষ করেছি তখন প্রফেসর গ্লাস আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে নিয়ে বললেন, মাই ডিয়ার সান, দয়া করে এখন শখের বশে অন্য কোনো ক্লাসে গিয়ে বসবে না। ডিগ্রি শেষ করো। আরেকটা কথা, আমেরিকান সিটিজেনশিপ পাওয়ার ব্যাপারে আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই।
আমি বললাম, আমেরিকান সিটিজেনশিপ দিয়ে আমি কী করব?
তুমি চাও না?
না, আমি চাই না। ডিগ্রি শেষ হওয়ামাত্র আমি দেশে ফিরে যাব।
বিদেশী ছাত্ররা শুরুতে সবাই এ রকম বলে। শেষে আর যেতে চায় না।
আমি চাই।
ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফিরলাম। সাত বছর আমেরিকায় কাটিয়ে যে সম্পদ নিয়ে ফিরলাম তা হলো নগদ পঞ্চাশ ডলার, দুই স্যুটকেস ভর্তি বাচ্চাদের পুরানো খেলনা, এক স্যুটকেস বই এবং প্রচুর চকলেট।
 
আমি যে সব সময় ইমপালসের উপরে চলি তা কিন্তু না। কাজে-কর্মে, চিন্তাভাবনায় আমি শুধু যে গোছানো তা না, অসম্ভব গোছানো। কখন কী করব, কতক্ষণ করব তা আগেভাগে ঠিক করা। কঠিন রুটিন। সময় ভাগ করা, তারপরেও হঠাৎ হঠাৎ কেন জানি মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। উদ্ভট একেকটা কাণ্ড করে বসি। কোনো সুস্থ মাথার মানুষ যা কখনো করবে না।
 
--অনন্ত অম্বরে। হুমায়ূন আহমেদ।

Monday, September 22, 2025

দায়িত্ব- কামরুন নাহার মিশু

 কামরুন নাহার মিশু

রাহাত সাহেবের ওয়ালেট থেকে ভুলবশত একটা ভাঁজ করা কাগজ উড়ে এসে আমার পায়ের কাছে পড়ল।

রাহাত সাহেব আমার কলিগ। আমরা একই অফিসে দীর্ঘদিন চাকরি করি। নাম আর পদবী ছাড়া তার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। আমিই আসলে জানতে চাইনি কোনোদিন। আজ কী মনে করে যেন সেই আমার সাথে এসে আলাপ জমিয়েছে। দুজনের গন্তব্য একই জায়গায় জানতে পেরে একটা রিকশায় চড়ে বসলাম দুজনে। গন্তব্য পৌঁছে রিকশা ভাড়া পরিশোধ করার সময় ওয়ালেট থেকে একটা কাগজ কীভাবে যেন এসে আমার পায়ের কাছে পড়ল।

আমি নিচু হয়ে কাগজটা তুলে নিয়ে আনমনে ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরলাম।

রঙিন কাগজে কী লেখা, এটা জানার জন্য আমার কৌতুহল হলো। স্ত্রীকে লেখা কোনো প্রেমপত্র নয় তো।

কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরে আমি আশাহত হলাম। টাকা বন্টনের একটা তালিকা।

গোটা গোটা অক্ষরে নীল কাগজে লাল কলম দিয়ে লেখা,

১) বাসা ভাড়া ১৮০০০ টাকা।
২) ইরার হাত খরচ ৩০০০ টাকা।
৩) ইফতির স্কুলের বেতন ১০০০ টাকা।
৪)ইফতির টিউটরের বেতন ৫০০০ টাকা।
৫) মায়ের ঔষধ ২০০০ টাকা।
৬) মিরার জন্য ৫০০০ টাকা।
৭) সংসার খরচ ১০০০০ টাকা।
৮) নিজের জন্য ৬০০০ টাকা


তালিকাটা পড়ে আমার মেজাজ খারাপ হলো। এটা কেমন তালিকা! হাজার পঞ্চাশেক টাকা বেতন পাওয়া রাহাত সাহেব নিজের জন্য খরচ করবেন মাত্র ৬০০০ টাকা।

এতদিন পর বুঝতে পারলাম রাহাত সাহেবের লোকাল বাসে ঝুলে ঝুলে অফিসে আসার কারণ।
তার মানে তিনি কিপটে না, খরচের সাথে তাল মেলাতে পারেন না।

রাহাত সাহেব হাসতে হাসতে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,

" শফিক সাহেব, দেখা হলো ?"
" জি।

" তাহলে এবার ফেরত দিন। যদিও তেমন গুরুত্বপূর্ণ তালিকা নয়। তারপরও ওয়ালেটে থাকে।"

আমি রঙিন কাগজে লেখা তালিকাটা রাহাত সাহেবকে ফেরত দিতে দিতে বললাম,

" আমরা দুইজন একই অফিসে দীর্ঘদিন চাকরি করি, অথচ কেউ কারো ব্যক্তিগত কোনো খবর জানি না।"

" এটা ভুল বলছেন শফিক সাহেব। আমি কিন্তু আপনার সম্পর্কে সবই জানি। আপনার দুই মেয়ে। ওরা যমজ, একই শ্রেণিতে পড়ে। ভাবি চাকরি করতেন একসময় বাহিরে, এখন ঘরে করেন। আপনি ভাড়া বাসায় থাকেন। পাশে আপনার বাবা- মা থাকেন বড় ভাইয়ের নিজের ফ্ল্যাটে। আপনি নিজেও চেষ্টা করছে একটা ফ্ল্যাট কিনতে।"

" আল্লাহ এত কিছু জানেন!"

" জি, জানতে হয়।"

"আমি তো আসলেই আপনার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। এখন অবশ্য কিছু কিছু জানি। আপনার বাসায় বাবা- মা আছেন। ইফতি, ইরা, মিরা নামের আরও তিনজন মেয়ে আপনার বাসায় থাকেন। সম্ভবত ইফতি আপনার মেয়ে। ইরা ভাবি আর মিরা ছোট বোন।"

" এক্সাক্টলি, আপনি ঠিকই ধরেছেন। যদিও একটু ভুল আছে।"

" ভুলটা কী, সেটা বলেন? "

" তেমন কিছু না। মিরা আসলে গিন্নীর ছোট বোন। আর সে আমাদের সাথেও থাকে না। যদিও আমি ওকে নিজের ছোট বোনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।"

" ভালো তো! আমার অবশ্য শালিকা নেই। তবে শালি, দুলাভাই সম্পর্কটা বেশ রোমান্সকর!"

" ও ভাবে তো কোনোদিন ভাবিনি। মিরা আমার ছোট বোনের মতো। আমাকে রেসপেক্ট করে, আমিও তাকে স্নেহ করি।"

রাহাত সাহেবের কথা শুনে আমি চুপসে গেলাম। বুঝতে পারলাম এই লোকের সাথে এপ্রসঙ্গে কথা বেশিদূর বলা যাবে না। মনে মনে বিড় বিড় করে বললাম,

শালিকা আবার ছোট বোন! যাই হোক, আমার তো সেটাও নেই।

আমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললাম,

" মেয়ে কোন শ্রেণিতে পড়ে আপনার? টিউটরের বেতন মাত্র ৫০০০টাকা। সব বিষয় কি পড়ায়?"

এবার রাহাত সাহেব হো হো করে হাসতে লাগলেন।

"৫০০০ টাকায় বাসায় এসে সব বিষয় পড়াবেন, এমন শিক্ষক আপনি কোথায় পাবেন?"

" সে জন্যই তো জানতে চেয়েছি।"

" ইরা মানে আমার স্ত্রী, সেই মেয়েকে পড়ায়।"

আমি অস্পষ্ট স্বরে বলে ফেললাম,

" তাহলে টাকা কেন?"

"কী যে বলেন! টাকা তে দিতেই হবে। বাহিরে পড়ালে দশের নিচে দিতে পারতাম না। এখন টিউটরের যে ডিমান্ড!"

আমার কোনো কিছুই বোধগম্য হলো না। মা তার সন্তানকে পড়ায় সে কারণে বাবাকে কেন টাকা দিতে হবে?

রাহাত সাহেবের স্ত্রী কি তার থেকে জোর করে টাকা আদায় করে নেয়। ও মাই গড, কী ডেঞ্জারাস মহিলা! ভাবতেই আমার ঘাম দিয়ে জ্বর এসে গেলো।

আলহামদুলিল্লাহ্, সে হিসাবে মিতু তো অনেক ভালো মেয়ে। আমার বাচ্চারা রোজ দুইবেলা তার কাছেই পড়ে। একটা টিউটর পর্যন্ত রাখতে হয়নি। কখনো তো তাকে একটাকাও দেইনি।

" বুঝলাম না রাহাত সাহেব, ভাবি কি আপনাকে...."

" না, না শফিক সাহেব সে আমার কাছ থেকে কখনোই টাকা চায়নি। আমিই দেই। আরও দেয়ার দরকার ছিল, কিন্তু সামর্থ নেই। ইরাকে যখন আমি বিয়ে করি তখন সে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিল। অসম্ভব মেধাবী ছিল, নিজেই টিউশনি করে নিজের খরচ জোগাতো সাথে বাবা -মায়েরও প্রয়োজন মেটাত। আমার সাথে বিয়ে হওয়ার পর সে আর পড়াশোনাটা চালিয়ে নিতে পারেনি।

তার কোনো ভাই নেই, ছোট একটা বোন আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সে কারণে এখন আমি মেয়েকে পড়ানোর জন্য তাকে আলাদাভাবে পারিশ্রমিকটা দেই।

মেয়েকে অন্য কোথাও পড়লেও তো সে টাকাই দিতে হতো। এতে সুবিধা হয়েছে দু'টো। মেয়েটা মাতৃস্নেহে পড়ছে আর ইরার শ্রমটা বাইরে গিয়ে দিতে হচ্ছে না।

আর মিরা, ইরার ছোট বোন। মানে তো আমারও ছোট বোন। আমাকে বিয়ে না করলে ইরা চাকরি করতো। সে টাকা দিয়ে বোনকে পড়াতে পারত। আমার কারণে তো মেয়েটার কিছুই হলো না। আমিও তেমন বিলাসিতা দিতে পারিনি। তারপরও একটু চেষ্টা করি আর কি!"

স্ত্রী সম্পর্কে এসব কথা বলতে বলতে রাহাত সাহেবের কণ্ঠ আদ্র হয়ে আসলো। এত দরদ নিয়ে কেউ স্ত্রী সম্পর্কে কথা বলে আমার একদমই জানা ছিল না।

এবার আমি তাচ্ছিল্য করে বললাম,

" কইয়ের তেলে কই ভাজা আর কি! ভাবি তো টিউশনি করে ভালোই রোজগার করে। আবার হাত খরচও দিচ্ছেন?"

" ওটা তার রোজগার। তার রোজগারের টাকা সে কোন খাতে খরচ করে আমি জানি না। হয় মায়ের জন্য খরচ করে, নয়তো মেয়ের জন্য। আর হাত খরচ তো দিতেই হয়। "

" ও আচ্ছা বুঝলাম।"

শফিক সাহেবের সাথে কথা বলার পর আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছে। বারবার মিতুর অসুখী চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। এত এত কিছু থাকার পরও মিতু অসুখী হয়ে থাকার কারণ মনে হয় এবার কিছুটা বুঝতে পেরেছি।

আমি ছুটে বাসায় গেলাম। দরজা খুলে দিয়েছেন বাবা। মিতু ছিল না। সে বারান্দায় বসে কার সাথে যেন কথা বলছিল। আমার উপস্থিতি টের পায়নি।

তার কণ্ঠে অপারগতা,
" না, আমার দ্বারা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমি কি চাকরি করি? অন্য কারো থেকে ব্যবস্থা করে নিন।"

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর মিতু আবারও বলছে,
" শফিকের টাকা থাকলে আমার কি! সে তো হাত খরচের জন্যও একটাকা দেয় না, যে জমিয়ে কিছু একটা করব। "

অপরপ্রান্তে কি বলছে সেটা বোধগম্য হচ্ছে না। মিতু বাররবার প্রবোধ দিয়ে বলছে,

" অহেতুক টেনশান করবে না। আমার সব আছে। শাড়ি, হাড়ি, গয়না, সব। সুখ আছে কি -না সেটা বলতে পারব না।"
 

এবার মিতুর কণ্ঠে ব্যর্থতা ঝরে পড়ে,



" না মা। আমায় ক্ষমা করো, আমি শফিককে কিছু বলতে চাই না।"



এবার আমি গলা খাকারি দিয়ে বললাম,



" কে ফোন করেছে মিতু? কি? আমায় বলতে চাও না?




মিতু ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গেলো আমার কণ্ঠ শুনে,



" না, কিছু না। এমনি মা ফোন করেছিল। বাদ দাও ওসব। তুমি কখন এলে? আমি তো বারান্দায় ছিলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখিনি তো তোমায়।"



" কথা বলছিলে তো, সেকারণে খেয়াল করোনি হয়তো।"



" সেটাই হবে। তুমি চেঞ্জ করো। আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসছি।"



মিতু চলে গেলো রান্নাঘরে। আমার জন্য চা বানাতে। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে আমি এক কাপ চা পান করি। আমি তাকিয়ে রইলাম মিতুর চলে যাওয়া পথের দিকে। এখনো মিতুর গায়ের বাতাসে পর্দা নড়ছে। আমার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।



মিতু ছিল আমার ইয়ারমেট। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম আমরা।

সে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ছেলেদের হার্টথ্রব ছিল। অথচ মাঝখান দিয়ে সবাইকে হারিয়ে মিতুকে জয় করে নিয়েছিলাম আমি।

সবাই মিতুর রূপের কাছে হার মেনেছে। আমি হার মেনেছি তার ভালো ফলাফলের কাছে। একটা ভালো চাকরি হবে মেয়েটার। এটাই লোভ ছিল আমার। আজকালকার দিনে তাড়াতাড়ি উপরে উঠতে চাইলে দু
জনেরই রোজগার লাগে।



চাকরিটাও আমার আগেই হয়েছে মিতুর। কর্পোরেট জব, স্মার্ট সেলারি। অফিসের গাড়ি। আমিও অপেক্ষা না করে তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলেছিলাম। অথচ তার চাকরির সুবিধা বেশিদিন ভোগ করতে পারিনি। বিয়ের দুই বছরের মাথায় যমজ বাচ্চাদের বাবা হলাম।



একসাথে দু'টো বাচ্চা নিয়ে সবকিছু সামলে উঠতে পারেনি মিতু। এদিকে ছেলেটাও অসুস্থ ছিল জন্মের পরপরই। হার্টে ছিদ্র। তাকে নিয়ে হাসপাতালে, বাসায় দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে চাকরিটাই ছেড়ে দিয়েছিল মিতু।

এখন মিতুর পরিচয় সে গৃহিণী। সে মা, সে মিসেস শফিক। তার যে আলাদা একটা পরিচয় ছিল, সেটাই ভুলতে বসেছে সবাই।



আমিও তাকে কম দেইনি। ভালো ফ্ল্যাটে রেখেছি, দামী ফার্নিচার কিনে দিয়েছি, দামী দামী শাড়ি -গয়না কিনে দিয়েছি। দু
টো সন্তান দিয়েছি। যে বয়সে বন্ধুরা এখনো বিয়ে করারই সাহস পাচ্ছে না, সে বয়সে আমি বিয়ে করে ফ্ল্যাট কেনার ফান্ডও জমিয়ে ফেলেছি।



কিন্তু আলাদাভাবে কোনোদিন মিতুর হাতে দশটা টাকাও তুলে দেইনি। উল্টো বাচ্চাদেরকে পড়ানোর জন্য আমিই তাকে জোর করেছি। শিক্ষিত গৃহীণি মা থাকতে বাচ্চারা টাকা খরচ করে বাহিরে পড়বে কেন? অথচ তাকে সম্মানী না দিয়ে কথা শুনিয়েছি।



মিতু নিজের জন্য বাড়তি কিছু খরচ করতে চাইলে রাগ হতো, বাজে খরচ করচে ভেবে বিরক্ত হতাম।

বাচ্চা নিয়ে অনেকে চাকরিও করছে আবার সংসারও দেখছে। অথচ বাচ্চা হওয়ার অজুহাতে চাকরিটা ছেড়ে দেয়ায় তাকে অকর্মণ্য বলে ভৎসনা করতেও ছাড়িনি।



তার বাবা-মার জন্য খরচ করতে কোনো দিন এক টাকাও দেইনি। উল্টো শ্বশুর বাড়ি থেকে কিছু না পেলে মিতুকে বিয়ে করে ঠকেছি ভেবে আমার রাগ হতো। বন্ধু শিহাবের শ্বশুর বাড়ি থেকে গাড়ি ভর্তি জিনিস আসছে শুনলে আমার নিজেকে দুর্ভাগা মনে হতো।

মিতু সব বুঝতে পারত। লজ্জায় সে মাথা নিচু করে থাকতো। আমার সাথে সহজ হতে পারত না।



অথচ মিতু ছিল আমার চেয়েও বেশি মেধাবী, চাকরিটাও আমার আগেই হয়েছে। আমার সন্তানের কারণে তাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে হয়েছে। যেখানে আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো, উল্টো তাকে আমি অসম্মানিত করেছি।


রহাত সাহেব আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। তার সাথে আজ কথা না বললে তো নিজের ভেতরের দীনতাকে একজীবনেও আবিষ্কার করতে পারতাম না।

মিতু চা আর পকোড়া নিয়ে আমার পাশে এসে বসল।

আমি মিতুর চোখের দিকে তাকাতে ভয় পাচ্ছি। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকে বললাম,

" মা, ফোন দিয়ে কী বলেছেন? বাবার শরীর ভালো তো!"

" কী আর বলবেন, বাবার শরীর ভালো নেই, সেটাই বলেছেন।"

" ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বলো। তুমি কি যেতে চাও?"

" না, বাবাকে এবার ঢাকায় এনে ডাক্তার দেখাবেন। কিন্তু..."

" কিন্তু আবার কি! তুমি আছো না, আমি আছি না। বাবা আমাদের এখানে থাকবেন। আমি ডাক্তার দেখিয়ে দেব।"

" ডাক্তর দেখাতে আসলে থাকার অসুবিধা হবে না। ছোট চাচার বাসায়ও থাকতে পারবেন। সমস্যা হচ্ছে টাকার। সেটাও ম্যানেজ হয়ে যাবে। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।"

" পাগলের মতো কথা বলছ কেন মিতু? মাকে বলো বাবাকে নিয়ে আজই চলে আসতে। টাকা তুমি দেবে।"

মিতু মাথা নিচু করে মিনমিন করতে লাগল,

" আমি টাকা পাব কোথায়? চাকরিটাও তো করতে পারলাম না।"

" কেন? তোমার বরের থেকে নিয়ে দেবে। সেও কি চাকরি করছে না? না-কি!


মিতু পূর্ন দৃষ্টি নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল। তার চোখে অবিশ্বাস। আমি মিতুর হাত চেপে ধরে তাকে মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করলাম।

চোখ ভর্তি জল নিয়ে মিতু হাসছে। মিতুর এই হাসিটা এত পবিত্র যে আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না।

আনন্দেও মানুষ কাঁদতে পারে? আর সে কান্নামিশ্রিত হাসি এত পবিত্র!

আমি মনে মনে রাহাত সাহেবকে ধন্যবাদ দিলাম। সে আমার অন্ধ চোখ খুলে দিয়েছে। স্ত্রীর ভালোবাসা পাওয়া এত সহজ, যেটা গাড়ি,বাড়ি,ফ্ল্যাট আর বিদেশ ভ্রমণ করিয়েও পাওয়া যায় না।



Thursday, March 13, 2025

কুশিগাঙ: নদী যখন রূপ নিয়েছে নালায়

 https://www.prothomalo.com/photo/bangladesh/qfoqepeehe

 সিলেটের সুরমা নদীর অন্যতম উপশাখা কুশি নদী। কুইগাঙ বা কুশিগাঙ নামে নদীটি বেশি পরিচিত। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর এলাকার হাওর থেকে প্রবাহিত পাবিজুড়ি, কাফনা ও করিস নদীর সমন্বিত অংশ থেকে সৃষ্টি হয়েছে ‘কুশি নদী’। বিভিন্ন হাওর-বিল হয়ে ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীটি মিলিত হয়েছে সিলেট নগরের সুরমা নদীর ‍কুশিঘাট এলাকায়। সিলেটের সুরমা নদীর সঙ্গে জৈন্তাপুরের সারি নদীর একমাত্র সংযোগ নদী কুশিগাঙ। মোগল আমলে উত্তর-পূর্ব সিলেটের পাহাড়ি জনপদে চলাচল ও বাণিজ্যের একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম ছিল কুশিগাঙের নদীপথ। স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নদীটি আশপাশের অঞ্চলে পানিপ্রবাহ ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে পানির চাহিদা পূরণ করে এলেও এখন নিজেই ধুঁকে ধুঁকে মরছে নদীটি। হারিয়েছে গতিপথ, ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদীর বিভিন্ন স্থান। বর্ষাকালে পানিতে টইটম্বুর থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে নদীটি যেন মৃত খাল। এ সময়ে নদীর দুই পাশে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই সবজি চাষ করেন। নদীর বুকে পড়ে থাকে মাছ ধরার নৌকা। খননের উদ্যোগ নিলে প্রাণ ফিরে পাবে নদীটি।

 

আমেরিকান সিটিজেনশিপ দিয়ে আমি কী করব?

  এই জীবনে বেশির ভাগ কাজই আমি করেছি ঝোঁকের মাথায়। হঠাৎ একটা ইচ্ছে হলো, কোনো দিকে না তাকিয়ে ইচ্ছাটাকে সম্মান দিলাম। পরে যা হবার হবে। দু-এ...