Showing posts with label Story. Show all posts
Showing posts with label Story. Show all posts

Saturday, September 28, 2024

মুই রাধা মইরা যাইমু

 মলয়বাবু গলাটা আস্তে করে বললেন -"ফোনটা কাটলে কেন?"

সরলাদেবী আগের থেকে গলায় একটু জোর এনে বললেন " বৌমা আপিস বেরাচ্ছিল,টিফিনটা দিলাম!"
মলয়বাবু একটু মজা করে বললেন " তাই গলায় এতো জোর!"
সরলাদেবী খিলখিল করে হেসে বললেন " লজ্জা লাগে না এই বয়সে এরকম ফোনে কথা বলতে!" মলয়বাবু বললেন " এই বয়সে প্রেম করতে ভালোই লাগে বলো!"সরলাদেবী লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছেন। ফোনের ওপার থেকেই মলয় বাবু বেশ বুঝতে পারছেন সেটা!
এই লজ্জায় লাল মুখটা দেখতে বড্ড ভালোবাসতেন মলয়বাবু ।সরলাদেবী অল্প বয়সে কথায় কথায় লজ্জা পেতেন । চোদ্দো বছরের ছোট ছিলেন সরলাদেবী মলয়বাবুর থেকে।বাচ্চা বউ - আদরে, আবদারে বুকে আগলে রাখতেন।
মলয়বাবু খেয়াল করলেন ওপাশে সরলাদেবী চুপ। " কি গো শুনছো? " সরলাদেবী বললেন " হমম " মলয়বাবু বললেন " চুপ কেন? " সরলাদেবী আলতো করে বললেন " রান্না করছি তো, কানে ফোন দিয়েই রান্না করছি!এক্ষুনি দিদিভাই আসবে স্কুল থেকে, এসেই খিদে পেয়ে যায় ওর !"
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মলয়বাবু বললেন " কত খাটনি হয় তোমার না গো?" সরলাদেবী গলায় আদর এনে বললেন " তুমি ফোন করলেই সব ক্লান্তি চলে যায়।, আর রান্না করতে ভালোই লাগে। আরও ভালো লাগে যখন ওরা খেতে বসে থালা চাটে!"
আজ তিনদিন হলো বুকে বড্ড ব্যথা। রাতে ঘুষঘুসে জ্বর আসে। কিচ্ছু কাজ করতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু করতেই হবে। কেউ জোর করেনি,সরলাদেবী নিজের থেকেই করেন। ডাল টা নামিয়ে কড়াই বসালেন মাছের ঝোলটা করবেন বলে!এটুকুতেই হাঁপিয়ে যাচ্ছেন। আর কানে চেপে কথাও বলতে পারছেন না। তাই বললেন " শোনো না ফোনটা রাখি, তুমি ওষুধ গুলো ঠিকঠাক খেও,শেষ হওয়ার আগেই ছোট খোকাকে বোলো, নিজের যত্ন নিও!
ফোনটা রেখে চেয়ারে এসে বসে পড়লেন মলয় বাবু।মাস আটেক আগে স্ট্রোক হলো সেই সুযোগ নিয়ে ছেলেগুলো ভাগ করে দিল দুজনকে ! একসাথে দুজনকে রাখা সম্ভব নয় ওদের।বড় ছেলের বউ চাকরি করে আট বছরের মেয়ে আছে তাই মাকে ওদের চাই। আর বোকা মা সেই আবদার ফেলতে পারেনি। আর ছোটটার সদ্য বিয়ে হয়েছে। তাই বাবা ওখানেই থাক।সুন্দর ব্যবস্থা।
এই ছেলেদেরকেই নাকি দুজনে মিলে ভিটে, মাটি, টাকা শেষ করে মানুষের মত মানুষ করেছেন! বুকটা ভার হয়ে গেল মলয়বাবুর। ইচ্ছে করে এক ছুট্টে যায় বড় খোকার বাড়ি একবার দেখে সরলাদেবীকে।
এতটা অসুস্থ ছিলেন মলয়বাবু তাই জোর করে বলতেও পারেননি যে " আমি তোদের মা কে ছাড়া থাকতে পারবো না!" আর কোন ভরসায় বলতেন, কি ছিল ওনার জীবনে। যেটুকু সম্বল ছোট খোকার ইঞ্জিনিয়ারিং য়ের সময় শেষ!থাক তাও শেষ বয়সে সরলা মাছ টা দুধ টা পায় ওখানে!
( বাবা গরম জল দিয়েছি বাথরুমে )
ছোট বৌমার চিৎকারে চেয়ার ধরে উঠে পড়লেন মলয় বাবু।
****
"বাবা তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠো দাদা ফোন করেছিল মায়ের নাকি শরীর ভালো নেই। "- মলয়বাবু শুনছেন দরজায় দাঁড়িয়ে ওনার ছোট ছেলে রথীন বলছে। আজ আট মাস এ বাড়িতেই আছেন উনি, একা। আর ওনার অর্ধাঙ্গিনী বড় ছেলের বাড়িতে। এখান থেকে ঘন্টা তিনেকের পথ।
" বাবা ওঠো তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে!" রথীনের কথায় ধৰ্মড় করে উঠে বসলেন মলয়বাবু। তাড়াতাড়ি নেমে দরজা খুলেই বললেন " বেঁচে আছে নাকি শেষ? "
"তুমি কি পাগল নাকি? সুস্থ মানুষ একটু শরীর খারাপ হয়েছে,তোমায় দেখতে চাইছে!আর কিসব কথা বলছো তুমি?" - ধমক দিয়ে বললো রথীন।
" সেই তো, সেই তো, সুস্থই তো ছিল তোদের মা, অসুস্থ তো আমি, এমন হাভাতে অসুখ! সব শেষ করে দিলো আমার, বুকটা খালি করে দিলো!"- একা একাই বলে যাচ্ছেন মলয়বাবু।
রথীন বাবাকে ধরে বললো " বাবা শান্ত হও,নিজেকে শান্ত করে তৈরী হও, এক্ষুনি বেরোবো, মা তোমাকে দেখতে চাইছে!" - বাবাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো প্রবীণ। ছেলের কাঁধে মাথা দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন মলয় বাবু। এতো বড় অসুখের পর উনি আছেন ঠিকই কিন্তু ওনার অর্ধেকটাই তো নেই!
*******
যতীনের বাড়িতে ঢুকতেই মলয়বাবুর নাকে ধূপকাঠির গন্ধ আসলো। উনি বুঝে গেছেন সবটাই।তাও আশা নিয়ে মনে শক্ত করে গাড়ি থেকে নামতেই বড় খোকা যতীন ছুটে এসে বললো " বাবা এতো দেরী কেন করলে, কতবার তোমার নাম ধরে ডাকলো!"
তারপর রথীনকে জড়িয়ে বললো " ভাই সময় দিল নারে!" মলয়বাবু ঘরে গেলেন না। বাইরেই সোফায় বসে পড়লেন। হাত পা কাঁপছে। ওখান থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখলেন এক মাথা সিঁদুরে, লাল শড়িতে নতুন বউ লাগছে সরলা কে। সেই আজ থেকে বাহান্ন বছর আগের আঠেরোর সরলা। সারাদিন নুপুর পরে ঝুমঝুম করে ঘুরে বেড়াতো খিলখিল করে হাসতো।কানে চাপা দিলেন মলয়বাবু। চোখ বন্ধ করে আছেন।
নাতনি এসে বললো " দাদুভাই ঠাম্মি এটা দিতে বলেছে তোমায়!"লুকিয়ে টিয়া একটা কাগজ দিল মলয়বাবুকে।
মলয়বাবু কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজ খুলে দেখলেন তাতে লেখা -
"কইয়োরে ভ্রমর,কৃষ্ণরে বুঝাইয়া-
মুই রাধা মইরা যাইমু কৃষ্ণহারা ।"
(একটা ছোট গল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল লেখাটা। )
🖊অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা

source: https://www.facebook.com/100083232380990/posts/529774529806955/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

Saturday, September 7, 2024

উপহার

 - আজকে একটু বেশি সময় থাকলে তোমার সমস্যা হবে?

- কেন ম্যাডাম? কোন কাম আছে?
- হ্যাঁ! তোমার স্যার কিছু মাছ পাঠাবে। ও একটা কাজে আটকে গেছে। তাই দেরি হচ্ছে।
- ফুলির আব্বারে আগে জিগাই লই ম্যাডাম। হেই অনুমতি দিলে তারপর থাকুম।
নিশা অবাক হয়ে সালমার দিকে তাকালো। সালমা ওর বাসায় কাজ করে ছয় মাস ধরে। মেয়েটা খুব ভালো আর কাজ করে খুব গুছিয়ে। সাধারণত ছুটা বুয়াদের কাজ এতো গুছানো হয় না।
সালমা কাজ করেও পরিষ্কার পরিছন্নভাবে। আগে যতজন ছুটা বুয়া ছিলো কেউ চুরি করতো, কেউ অপরিষ্কার, কেউ সময়মতো আসতো না ইত্যাদি।
সালমার এমন কোন সমস্যা নেই।
সময়মত আসে, ঠিকঠাক কাজ করে চলে যায়। কথা বলে খুব কম। প্রয়োজন ছাড়া কোন কথা বলে না।
সালমার আগে যে কাজে ছিলো ওই ছুটা বুয়া খুব নোংরা ছিলো। ওকে দিয়ে দুইদিন কাজ করিয়ে নিশা পুরো মাসের বেতন দিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। তারপর নিজেই কয়েকদিন ঘরের কাজ করেছে।
অনভ্যস্ত হাতে নিশা খুব একটা গুছিয়ে উঠতে পারেনি। সাথে ৩বছরের একমাত্র মেয়ে খুব বিরক্ত করে।
তাছাড়া নিশা অসুস্থ থাকে একটু বেশিই। দারোয়ানকে বলে রেখেছিলো যেভাবেই হোক দ্রুত একজন ছুটা বুয়া জোগাড় করে দিতে।
দারোয়ান তার এক বোনের মাধ্যমে সালমার খোঁজ পায়। তারপর সরাসরি সালমার সাথে নিশার পরিচয় করিয়ে দেয়। পরদিন থেকেই সালমা নিশার বাসায় কাজ করে। নিশা সালমার কাজে, ব্যবহারে খুব খুশী।
- তোমার ফুলির আব্বা অনুমতি দিলো ?
- জি ম্যাডাম!
- সবকিছুতে ফুলির আব্বার অনুমতি নেওয়া লাগে ?
- ফুলির আব্বাও তার হগল কামে আমার অনুমতি নেয়। আমিও আমার কামে হের অনুমতি নেই।
- তোমাদের বিয়ে হয়েছে কতবছর ?
- পাঁচ বছর ম্যাডাম।
- ফুলির বয়স কত ?
- দুই বছর
- ফুলি কার কাছে থাকে?
- ফুলি তার আব্বার কাছে থাকে।
- ফুলির আব্বা কোন কাজ করে না ?
- ফুলির আব্বা অসুস্থ ম্যাডাম।
নিশার খুব ইচ্ছে হলো সালমার জীবনের গল্প শোনার। কিন্তু হুট করে জিজ্ঞেস করতে কেমন বিব্রত লাগছে তার। আর সালমাও এতো অল্প কথায় উত্তর দেয় নিশার মনে হয় সালমা খুব বেশি কথা বলতে পছন্দ করে না।
অথবা সে তার জীবনের গল্প হয়তো বাহিরে কাউকে বলতে চায় না। এমন সময় ড্রাইভার মাছ নিয়ে হাজির হলো।
অনেক গুলো ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছে ড্রাইভার।
সালমা মাছ কাটতে বসলো। নিশার মনে হতে লাগলো এমনিতে আজকে সালমাকে আটকে রেখেছে, আবার এতগুলো মাছ কাটতে ওর আরো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
তাই সে নিজ থেকে এগিয়ে গিয়ে বললো কিছু মাছ আস্ত ড্রিপ ফ্রিজে রেখে দিতে। পরদিন এসে কাটতে। সালমা বললো তার সমস্যা হবে না। সে আজকেই কেটে যাবে।
নিশা একটা চেয়ার টেনে সালমার সামনে বসলো। নিজ থেকেই বললো সামনের সাপ্তাহে তার একমাত্র মেয়ে তানিয়ার জন্মদিন। তানিয়ার বাবার অফিসে কিছু বিদেশী কলিগ আছে।
তাদের জন্য দেশি খাবারের বিশাল আয়োজন করা হবে। আজকের ইলিশ মাছগুলো সেই প্রোগামের জন্যই নিয়ে আসা। সালমা নিশার কথা শুনছে আর মাছ কাটছে। মাঝে মাঝে নিশার কথার সাথে হ্যাঁ, হুম করছে।
- ফুলির বাবা কবে থেকে অসুস্থ ?
- দেড় বছর হইয়া গেলো।
- কী হয়েছে ফুলির বাবার?
- রিক্সা চালাইতো। একসিডেন্ট করছিলো। প্রাইভেট কার ডাইন পায়ের উপর দিয়া গেছে গা। ডাইন পায়ের অর্ধেক এখন নাই হের।
- কী বলো! তোমার তো অনেক কষ্ট হয় এখন। সব সামাল দাও কিভাবে ?
- ঘরের রান্নাবান্না ফুলির আব্বা কইরা রাখে। ফুলিরে রাখে। আমি আফনার বাসা লইয়া ৪বাসায় কাম করি। বাসায় গিয়া কিছুক্ষন ঘুমাই। তারফর কোন কাম থাকলে করি। তয় ঘরের কাম আমার করণ লাগে না। সব ফুলির আব্বা করে। ফুলিরেও রাখে।
- বাহ্! ফুলির বাবা তো তোমাকে খুব যত্নে রাখে।
- জি ম্যাডাম!
নিশা হুট করে উঠে নিজের রুমে চলে গেলো। তানিয়া পেটে থাকতে একদিন রাতে তার ঘুম আসছিলো না। খুব অশান্তি লাগছিলো।
বিছানা থেকে উঠে সে কতক্ষন রুমে পায়চারি করে। কিন্তু অশান্তি দূর হচ্ছিলো না। তখন সে আসাদকে আলতো করে ডাকে।
আসাদ চোখ খুলে খুব জোরে নিশাকে ধমক দিয়েছিলো আর বলেছিলো সারাদিন পরিশ্রম করার পর এতরাতে নাটক দেখার সময় তার নেই।
আসাদ বরাবরই একটু কেমন জানি! টাকা ইনকাম করাই তার একমাত্র নেশা। পরিবারে আলাদা করে সময় দেওয়া, বৌ মেয়ের আলাদা যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে বরাবরই তার অনীহা।
এই যে তানিয়ার জন্মদিন পালন করবে এটা তানিয়াকে ভালোবেসে না বা তানিয়া তার একমাত্র মেয়ে এইজন্য নয়। অফিসে নিজের স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য নিজের মেয়ের জন্মদিন বড় করে পালন করছে।
অফিসের কলিগদের জন্য সব আলাদা ব্যবস্থা করেছে। বিয়ে করেছে, বাচ্চা নিতে হবে তাই আসাদ বাচ্চা নিয়েছে।
বাচ্চাকে আলাদা সময় দিতে হবে, বাচ্চার টানে ঘরে আসবে বা দিনে বাচ্চার খোঁজ খবর নিবে এসব ব্যাপার আসাদের মধ্যে নেই।
আসাদের মাথায় সারাক্ষণ ঘুরে টাকা আর সমাজে, সংসারে, অফিসে তার স্ট্যাটাস কতটুকু বাড়লো বা বাড়ানো গেলো।
আসাদের এমন চিন্তা ভাবনা আর ব্যবহারে নিশার মনে অভিমান জমতে জমতে পাহাড় হয়ে গিয়েছে। কিন্তু নিশা কখনো মুখ ফুটে এসব কথা বলে না।
বিয়ের প্রথম প্রথম বলতো কিন্তু যখন দেখলো আসাদের মধ্যে নিজেকে পরিবর্তন করার কোন লক্ষণ নেই তখন চুপ হয়ে গেলো।
উল্টা আসাদ নিজের খামখেয়ালিপনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এইদিকে নিশা নিজের আলাদা জগৎ বানিয়ে নিয়েছে।
কাউকে নিজের কথা বলে না। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু -বান্ধব সবাইকে এড়িয়ে চলে। বাহিরে প্রয়োজন ছাড়া তেমন বের হয় না।
আজকে সালমার কথা শুনে বহুদিনের জমানো অভিমান কেমন উথলে উঠলো। হুট করে নিশার খুব কান্না পেলো।
ওর বিশাল বাসা টাকা পয়সা, ব্যাংক ব্যালান্স সব আছে কিন্তু পাশে বসে কাঁধে হাত রাখার মানুষ নেই। অথচ সালমার এমন কিছুই নেই কিন্তু ভালোবাসার মানুষ আছে।
ঘরে কেউ একজন সালমার জন্য অপেক্ষা করে, সালমার কেয়ার করে, সালমার ভালো মন্দের খেয়াল রাখে। এইদিক থেকে সালমা অনেক ধনী আর সে খুব গরীব।
নিশা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হুট করে কেঁদে উঠলো। অনেক দিনের জমানো কান্না একসাথে বের হয়ে আসলো। নিশা সমানে কেঁদে যাচ্ছে।
- ম্যাডাম! মাছের কাম শেষ। আমি এহন বাড়ি যামু।
নিশা তাড়াহুড়া করে দুইহাত দিয়ে চোখ মুছে মুখ না ফিরিয়ে সালমাকে যেতে বললো। সালমাও চলে গেলো। নিশা ধীরে সুস্থে উঠে দরজা লক করলো।
তারপর ভাবলো বিয়ের আগে আসাদ কেমন ছিলো আর বিয়ের পর কিভাবে এবং কতটা বদলে গেলো। কেউ অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য লড়াই করে, আর কেউ একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য লড়াই করে।
- তোমারে এক ম্যাডামের কতা কইছিলাম না? আমার খুব পছন্দের ম্যাডাম। ওর একটা মাইয়াও আছে আমাগো ফুলির মতো। তার জন্মদিন সামনের সাপ্তাহে। বিশাল আয়োজন করতাছে তারা।
- তাইলে তোমারও কাম বাড়লো।
- হ! তাতো বারবোই। বিদেশী মেহমানও নাকি আইবো। তাগো লাইগ্যা দেশী খাবারের আয়োজন করবো।
আজকে মেলাডি ইলিশ মাছ আনছে। সব কাইটা দিয়া আইলাম।
- আমি সুস্থ থাকলে আমাগো ফুলির জন্মদিনও বড় কইরা করতাম। তই আমরা দেশী না, বিদেশী খাবারের আয়োজন করতাম।
এই কথা শেষ করে জব্বার আর সালমা দুইজনই হেসে দিলো। জব্বার মন থেকে কথাটা বললেও একটু মজার ছলে বলেছে।
সালমা মজা ভেবেই হেসে দিয়েছে। সালমার হাসি দেখে জব্বারও হেসে দিয়েছে। দুইজন আরো কিছুক্ষন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শেষ করে ঘুমাতে গেলো।
- দেখো তো সালমা এই কালারটা কেমন লাগে?
- রংটা সুন্দর। আফনারে মানাইছে।
- ঠিক বলছো ?
- জি ম্যাডাম! খুব সুন্দর লাগছে আফনারে।
- তাহলে এই কালারটা ফাইনাল। তানিয়া আর ওর বাবার জন্যও একই কালারের আর ডিজাইনের ড্রেস নিবো।
- সবাই এক রংয়ের পোশাক পরবেন?
- হ্যাঁ! ভালো হবে না বলো ?
- জি ম্যাডাম!
- আচ্ছা সালমা শোন! তোমাকে এই কয়দিন একটু বেশি সময় দিতে হবে। আরেকটা কথা প্রোগ্রামের দিন ফুলি এবং ফুলির বাবাকে অবশ্যই নিয়ে আসবা। সপরিবারে তোমাদের নিমন্ত্রণ।
- ম্যাডাম! আফনে আমাকে দাওয়াত দিলেন ?
- হ্যাঁ! কেন ?
- কত বাসায় কাম করি। কোনোদিনও কেউ এমন কইরা দাওয়াত দেয় নাই।
- এসব কথা বাদ দাও। আনন্দের সময় আনন্দের কথা বলতে হয়। মন খারাপের কথা বাদ দাও।
সালমা চোখ মুছে হাসলো। তানিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করলো। সেদিনের মতো কাজ শেষ করে বিদায় নিলো।
- যে ম্যাডামের মাইয়ার জন্মদিন ওই ম্যাডামে তোমারে আর আমাগো ফুলিরেও দাওয়াত করছে।
- সত্যি কইতাছো ? তোমার ম্যাডামের মন অনেক বড় মনে অইতাছে।
- ম্যাডাম অনেক ভালা মনের মানুষ। হেই লাইগ্গা তো হেরে আমি অনেক পছন্দ করি। আমার লগে কত সুন্দর কইরা কতা কয়।
- তোমার ম্যাডামের মাইয়ার লাইগ্গা একটা সুন্দর উপহার কিনতে হইবো।
- কী দেওন যায় কওতো!
- মাইয়ার কী পছন্দ হেইডা তো তুমি জানবা ভালো। তুমি কাইল জাইনা আইয়ো।
- আইচ্ছা!
অনেকদিন জব্বার বাহিরে যায় না। তাই জব্বারের তেমন কোন নতুন ড্রেস নেই। সালমা ভাবছে জব্বারের জন্য নতুন শার্ট, প্যান্ট কিনতে হবে। ফুলির জন্যও নতুন একটা ফ্রক কিনবে। তার নিজেরও তো তেমন নতুন কিছু নেই।
গ্রাম থেকে আসার পর এই প্রথম তারা কোন দাওয়াতে যাবে । তাও এতো বড়লোকের বাড়ির অনুষ্ঠানে। এইদিকে জব্বারও ভাবছে সালমার নতুন কোন পোশাক নেই।
ওর জন্য নতুন পোশাক কিনতে হবে। দুইজনেই দুইজনের জন্য ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলো।
পরেরদিন সালমা কাজ শেষ করে নিশার সামনে কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। সালমার দাঁড়ানো দেখে নিশা জানতে চাইলো সালমা কিছু বলবে কিনা।
- ম্যাডাম! আমার একটা কাম কইরা দিবেন ?
- কী কাজ?
- কইতে ডর লাগতাছে। আফনে অন্য কিছু মনে করবেন নাতো ?
- না না! তুমি বলো। কোন সমস্যা নেই।
- আপনি নিজের জন্য, স্যারের জন্য আর মামনির জন্য এক রংয়ের পোশাক নিবেন না ? তেমনি এক রংয়ের পোশাক আমার জন্য, ফুলির বাপের জন্য আর ফুলির জন্য কিন্না দিতে পারবেন ?
নিশা অবাক হয়ে সালমার দিকে তাকিয়ে আছে। নিশা পোশাকের দামের ব্যাপারে ভাবছে না। ভাবছে সালমার শখের ব্যাপারে, সাধের ব্যাপারে।
- পারবো না কেন? অবশ্যই পারবো। তুমি ফুলি আর ফুলির বাবার মাপ জানো ?
- কাল জাইন্না আমু। ম্যাডাম টাহা কত লাগবো?
- টাকা নিয়ে তোমাকে এখন ভাবতে হবে না। পরে দিও।
- যহন ফুলির বাপে কামাই করতো তখন হেই প্রতিদিন কামে যাওয়ার আগে আমার হাতে কিছু কিছু টাহা দিয়া যাইতো। আমি হেই টাহা সব জমাই রাখছি।
এহন প্রতি মাসেও কিছু টাহা আলাদা করে রাহি। এই টাহা জমাইতেছিলাম ফুলির কানের সোনার জিনিসের লাইগ্গা। ফুলি জন্ম নেওয়ার কয়েকমাস পরেই ফুলির বাপের দুর্ঘটনা ঘটে।
এরপর আমাদের হগল আনন্দ মাটি হইয়া গেছে। আপনি দাওয়াত দিলেন ফুলির আব্বায় খুব খুশি হইছে। আপনি কাল কইলেন আপনি, স্যার আর মামনি একরহম পোশাক পরবেন। কাল রাতে আমিও ভাবলাম আমি, ফুলির আব্বা আর ফুলি একরহম পোশাক পড়ুম।
- তোমার মন খুব সুন্দর সালমা। তোমাকে এই জন্য আমার খুব ভালো লাগে। তুমি কাল মাপ জানাও। টাকা পরে নিবো।
বাকি তিন বাসায় কাজ করে সালমা কত পায় নিশা জানে না। তবে নিশার বাসা থেকে মাস শেষে যতটুকু টাকা সালমা পায় তার কয়েকগুন বেশি টাকা খরচ হবে এই তিনজনের সেইম কালার আর ডিজানের পোশাকে।
এই কথাটা নিশার বলতে খারাপ লাগছিলো।
দামের কথা শুনে সালমা হয়তো পিছিয়ে যাবে। মনে মনে একই রঙের এবং ডিজাইনের পোশাক পরার যে স্বপ্ন সালমা দেখেছে সেটা হয়তো ভেঙে যাবে।
খুশী খুশী মনে সালমা সেদিন কাজ শেষ করে মার্কেটে গেলো। তানিয়ার জন্য জন্মদিনের উপহার কিনতে হবে। সালমা অনেক ঘুরেও তানিয়ার জন্য উপযুক্ত উপহার খুঁজে পেলো না।
যা দেখে তা পছন্দ হয় না, যেগুলো পছন্দ হয় সেগুলো টাকাতে কুলায় না। অনেক ঘুরেফিরে খালি হাতে বাসায় ফিরে আসলো সালমা।
- তোমার ম্যাডামের মেয়ের জন্য কী কিনবা কিছু ভাবলা ?
- আজকে কাম শেষ করে একটু মার্কেটে গেছিলাম। যা পছন্দ হয় সেগুলো সাধ্যে কুলায় না। চাইলেই তো সবকিছু তানিয়া মামণিকে দেওন যাইবো না।
- আমাগো মাটির ব্যাংকটা ভাইঙ্গা দেহো কত টাহা জমছে। সেই টাহার লগে আরো কিছু টাহা মিলাইয়া সোনার কিছু দেওন যায় কিনা দেহো।
- আইচ্ছা! দেখতাছি।
মাটির ব্যাংক ভেঙে সালমা দেখলো খুবই সামান্য কিছু টাকা জমেছে। অনেক ভাবনা চিন্তা করে সালমা ঠিক করলো তার ম্যাডামকে পোশাকের টাকা পরের মাসে দিবে।
পোশাকের জন্য যে টাকাটা খরচ করবে বলে ঠিক করেছে সেটা দিয়ে তানিয়ার জন্য উপহার কিনবে।
এইদিকে নিশা নিজেদের জন্য সে কালার আর ডিজাইন অর্ডার দিয়েছে, সেইম কালার এবং ডিজাইন সালমা, তার স্বামী এবং মেয়ের জন্য অর্ডার দিলো।
জীবনে কে কবে দেখেছে নিজের মেয়ের জন্মদিনে নিজেরা যেমন ড্রেস পরবে , সেইম একই ড্রেসের অর্ডার কেউ তার হেল্পিং হ্যান্ড এবং তার পরিবারের জন্য করে।
জীবনে কে কবে দেখেছে নিজের মেয়ের কানের দুলের জন্য জমানো টাকা দিয়ে যার বাসায় কাজ করে তার মেয়ের জন্মদিনের উপহার হিসেবে সেই মেয়ের জন্য কানের দুল কিনতে।
ভালোবাসা ফিরে আসে। অন্যের জন্য ভালো কিছু করলে নিজের সাথেও ভালো কিছু ঘটে।

ফারজানা আক্তার

source: https://www.facebook.com/groups/1232033027465545/permalink/1410322562969923/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

অনুপ্রেরণা

 বিয়ের পরেরদিন আমার স্ত্রী "বেলা" পরিবারের সবার জন্য দুপুরে নিজ হাতে রান্না করেছে। সবাইকে খাবার পরিবেশন করে উচ্ছাসিত কণ্ঠে জানতে চাইলো, "মুরগীর মাংসটা কেমন হয়েছে?"

আমি সবেমাত্র এক লোকমা ভাত মুখে তুলে ছিলাম, এখন গলা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অতিরিক্ত লবন, মরিচের ফলে মাংসের স্বাদ নষ্ট হয়ে অ'খা'দ্য হয়েছে। আমি কিছু বলার আগেই আমার আম্মা আমায় ইশারায় চুপ থাকতে বললো। এরমধ্যে পাশ থেকে বাবা মাংস চিবাতে চিবাতে বললো, "বউমা রান্নাতো দারুণ হয়েছে! আজকে মনে হচ্ছে আমার মায়ের হাতের সেই সুস্বাদু খাবার খাচ্ছি।"
বেলা খুশিতে গদগদ করে বললো,
"বাবা আপনাকে আরেকটু মাংস দেই?"
"দেও বউমা। আজকে ডালটাও খুব মজা হয়েছে।"
বেলা হাসি হাসি মুখে বাবা'কে তুলে এটা সেটা দিচ্ছে, বাবা প্রশংসা করছে। আমি হঠাৎ খেয়াল করলাম রান্না করতে গিয়ে ওর ডান-হাতটা পু'ড়ে গিয়েছে। বাবা'র ঘরে খুব আহ্লাদী মেয়ে বেলা, রান্না ঘরের ধারে-কাছেও যায়নি কখনো। আজ ওর পো'ড়া হাতের দিকে তাকিয়ে সবাই চুপচাপ এই অখাদ্যই অমৃত মনে করে গিলে নিলাম। সব শেষ করে বেলা যখন খেতে বসলো। খাবার মুখে নিয়েই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। পরমুহূর্তে অপরাধীর ন্যায় মুখ কালো করে বললো,
"এতো জঘন্য খাবার তোমরা কি করে খেলে? আমি সব খাবার গুলোই নষ্ট করে ফেললাম।"
মা ওর মুখে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বললো, "রান্না করতে করতে একদিন সব শিখে যাবে মা। মন খারাপ করো না! আমরা কিচ্ছুটি মনে করিনি।"
আমাদের উৎসাহ আর সবার থেকে সাপোর্ট পেয়ে বেলা হতাশ না হয়ে মায়ের কাছ থেকে বিভিন্ন রান্না আগ্রহ নিয়ে শিখছে। ইউটিউব দেখে নিত্য নতুন রেসিপির ট্রাই করছে। যদিও খুব একটা ভালো হতো না সেসব, হয়তো লবনে বেশি বা কম হতো নয়তো ঝাল হতো, পুড়ে যেতো। তবুও আমার মা-বাবা বলতো খুব ভালো হয়েছে খাবার। মাঝে-মধ্যে আমি খুঁত ধরলে আম্মা রেগে গিয়ে বউয়ের সাপোর্ট করতেন। এতে বেলা আনন্দে পায়। আমি বললেও সেসব মন থেকে বলতাম না। আসলে যাতে আমার বউকে মা-বাবা কথা শুনানোর সুযোগ না পায়, সেজন্য তাদের কথা গুলো আমি বলে দিতাম। আবার সবার আড়ালে সরি ও বলতাম বেলা'কে।
বিয়ের পনেরো দিন পর আজ অফিসে আসছি। সকালে আমার বউ যত্ন করে দুপুরের খাবারের টিফিন রেডি করে তুলে দিলো আমার হাতে।আবার লাঞ্চ টাইমে কল দিয়ে বললো, "খেয়েছো মাহমুদ?"
"না। মাএ কাজ শেষ হলো। এইতো এখন খাবো। তুমি খেয়েছো?"
"উঁহু। তুমি খেয়ে নেও, আমিও এখন খাবো।"
"আচ্ছা রাখছি। টেক কেয়ার।"
হাসি মুখে বউয়ের কল কেটে খেতে বসলাম। বক্স খুলে দেখি ভাত, আধপোড়া শাক ভাজি, আর মাছ দিয়েছে বউ। আমি বউয়ের হাতের এই পোড়া তিতকুটে স্বাদের খাবার খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছি। এই খাবারে যতটুকু ভালোবাসা মিশানো আছে, তা ওই বড়সড় রেস্টুরেন্টের খাবারেও কখনো পাইনি। এরিমধ্যে আমার কলিগ শাহাদাত এসে বললো, "এতো মজা করে, কি খাচ্ছেন ভাই?"
"এইতো ভাই শাক আর মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছি।"
"নতুন ভাবি রান্না করেছে নাকি?"
"জি, আপনার ভাবিই রান্না করেছে।"
"নতুন ভাবির হাতের রান্না নিশ্চয়ই লোভনীয়!"
"তা বটে!"
"আপনার কপাল ভাই! দুইবছর হলো বিয়ে করছি তাও আপনার ভাবির হাতের রান্নায় কোনো স্বাদ পাই না। কি যে রাঁধে!"
হতাশ হয়ে আমার পাশের চেয়ারটায় বসে খাবার বের করলো শাহাদাত ভাই। উনার মুরগির মাংসের ঘ্রান ছড়িয়ে গিয়েছে, কালার টাও সুন্দর। দেখেই মনে হচ্ছে, রান্না মজা হয়েছে। তবুও কিছু পুরুষ আছে নিজের স্ত্রী যত ভালোই রাঁধুক পেটপুরে খেয়েও বলবে, ভালো হয়নি। এরা কখনো তো প্রশংসা করেই না উল্টো খুঁত ধরে। এদের কাছে পরের হাতের বিশ্রী স্বাদের খাবারও মজার হয়। আমি আর কিছু না বলে চুপচাপ খাচ্ছি। তা দেখে উনি আবারও বললেন, "নতুন বউয়ের হাতের খাবার একা একা খান কেন মিয়া! আমাদেরও একটু শেয়ার করেন।"
আমি বাধ্য হয়ে এক-টুকরা মাছ তুলে দিলাম উনার পাতে। আমার বউয়ের হাতের লবনাক্ত মাছ উনি একটুখানি মুখে দিয়েই মুখ কুঁচকে ঠাট্টা করে বললেন,"আপনার খাওয়া দেখে ভাবলাম ভাবির হাতের রান্না না জানি কত মজা! এটা মাছ ভাজি নাকি তেঁতো করলা? এসব বিশ্রী খাবার আপনি কেমনে গিলেন ভাই? হুদাই খাবার নষ্ট করা!"
আমি মুচকি হেসে বললাম, "আপনি খাবারের স্বাদ খুঁজলেও আমি এতে খুঁজে পেয়েছি ভালোবাসা ভাই। আমার স্ত্রী ভোর পাঁচটায় উঠে একা একা সব গুছিয়ে আমাকে গরম গরম রান্না করে সকালে খাইয়ে দেয়। আসার সময় মনে করে দুপুরের খাবারের বক্স হাতে তুলে দেয়। যে মানুষটা আমার জন্য এতকিছু করে, তার খাবার কি করে খারাপ হয় বলুন তো? আজ রান্না খারাপ হয়েছে তো কি হয়েছে? একদিন ঠিক ই ভালো হবে।"
এরমধ্যে আমার খাওয়াও শেষ। আমি আর কিছু উনাকে না বলতে দিয়ে চুপচাপ উঠে দাঁড়ালাম। বউকে কল দিয়ে বললাম, "আজকের রান্নাটা অনেক মজা হয়েছে বেলা।"
বউ খুশী হলো। উৎসাহিত কণ্ঠে জানালো, "আজকে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমি তোমার পছন্দের পায়েস বানাচ্ছি।"
আমি হেসে সম্মতি জানালাম। ফোন কেটে নিজের কাজে গেলাম।
_________
পাগলীটার সাথে দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেলো। আজ আমাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। সেই উপলক্ষে নিকটতম আত্মীয় স্বজন ও শাহাদাত ভাইকে দাওয়াত দিয়ে, ঘরোয়া আয়োজন করেছি। কেক কাটার পর্ব শেষ করে সবাইকে খাবার দিয়েছি। সবাই খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছে। এরমধ্যে শাহাদাত ভাই খাবার মুখে দিতে দিতে বললেন, "কাচ্চিটা যা হয়েছে না ভাই! কোন রেস্টুরেন্টে থেকে অর্ডার করছেন?"
আমি কিঞ্চিৎ হেসে বললাম, "এগুলো সব আপনার ভাবিই রান্না করেছে ভাই। বলছিলাম না একদিন ঠিকই রান্না শিখে যাবে। বুঝলেন ভাই, ঘরের বউকে ভালোবাসতে হয়। তাদের খারাপ কাজেও গাল-মন্দ না দিয়ে উৎসাহ দিতে হয়। এতে তারা হতাশাগ্রস্ত না হয়ে মনোবল পায়, কাজের প্রতি মনোযোগী হয়। বাবার ঘরের অকর্মা মেয়েটাও আজ কাজ না পারলে, কাল ঠিকই শিখে যায়। শুধু এই সময়ের আপনার/আমার করা ব্যবহারটা তার মনের মাঝে রয়ে যায়। বুঝলেন ভাই?"
(সমাপ্ত)
লেখনীতেঃ #সুমাইয়া_আফরিন_ঐশী

source: https://www.facebook.com/100014866035700/posts/1980995059072676/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v


বই বিজনেস

 আমার বান্ধবী নুসরাতের ঠিকানায় কেউ একজন দশটা বই পাঠিয়েছে। চিরকুটে লেখা, ‘বইমেলা থেকে তোমার প্রিয় কিছু বই পাঠালাম।’

নুসরাত সেই বই নিয়ে ঝামেলায় পড়ছে। বাসায় নিলে সমস্যা। অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। বাধ্য হয়ে সে বইগুলো আমার কাছে রাখতে দিলো।
পরের দিন নুসরাত আবার আমাকে ডেকে নিয়ে বললো, ‘দোস্ত আজকেও কুরিয়ার অফিস থেকে কিছু বই আসবে। তুই প্লিজ রিসিভ করে তোর বাসায় নিয়ে নে।’
যথা সময়ে আমি রাস্তার মোড়ে গেলাম। দেখি কুরিয়ারের এক লোকের হাতে কাগজে মুড়ানো চারটা বইয়ের গাট্টি। কোরিয়ার লোক জাস্ট অবাক হয়ে বললো, ‘ভাই সাব, এই এক নুসরাতের ঠিকানায় ঢাকা,চট্টগ্রাম, খুলনা সব জায়গা থেকে বই আসে কেমনে? উনি কী বইয়ের ডিলার নাকি?’
আমি কিছু বললাম না। বাসায় এসে বইগুলো খুললাম। আজকে মোট ৪৫টা বই। সাথে কয়েকটা নীল খামের চিরকুটও। একটায় লেখা, ‘এই যে, বইপড়ুয়া মেয়ে, তোমার না অনেক বই পড়ার শখ, একটুখানি ভালোবাসা দিলাম। তোমার শখ পূরণ করাই আমার নেশা।’ আহ কী সুন্দর ভালোবাসা।
আজকে দেখি হঠাৎ আমার ফেসবুক পরিচিত এক বড় ভাই নক দিয়ে বললেন, ‘ ছোট ভাই, তোমার বাসা সুনামগঞ্জ না? তোমার ঠিকানায় কিছু বই যাবে। ঐ বইগুলো একজনকে দিও। মানুষটা তোমার জেলার। ওরে আমি সারপ্রাইজ দিতে চাই। প্লিজ এতটুকু কষ্ট করো। কোরিয়ারে দিলে মেয়েটা জেনে যাবে।’
তারপর সব তথ্য নিয়ে বুঝলাম, বইগুলো নুসরাতকে দিতে হবে। অথচ এই ভাইকে আমি চিনি। উনি তিন বছর আগে একবার বলছিলেন, আমাকে বই উপহার দিবেন। তারপর থেকে নাকি উনি আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছেন। উনার অর্থনীতির চাকা নাকি ধ্বসে গেছে। এখনো সেই ক্ষতি কাটায়ে ওঠতে পারেন নাই। এদিকে নুসরাতকে উনি সব মিলিয়ে ১৫টা বই উপহার দিছেন। কী অদ্ভুত এসব বড় ভাইয়েরা।
যাইহোক, এসব বড় ভাইদের কারণে নুসরাত আর আমার ‘আপনার বইঘর’ নামক একটা অনলাইন বুকশপ চালু হয়ে গেছে। আমাদের সংগ্রহে এখন ২০০+ বই আছে। ভালোই চলছে আমাদের বই ব্যবসা।
এই পুরো প্লানটা আমার। যখন দেখলাম ফেসবুকের বই পড়ুয়া ভাইয়েরা সুন্দ্রী মেয়ে দেখে বই উপহার দেন, তখন আমি নুসরাতের দ্বারস্থ হই। নুসরাত এসব কাজে অনেক পটু। এই চমৎকার বিজনেস আইডিয়া ওকে বুঝিয়ে বলি।
তারপর নুসরাত ফেসবুকে নতুন একটা আইডি খুলে বই পড়ুয়া মেয়ে সাজে। সে আইডির পাসওয়ার্ড আমার কাছেও আছে। যেহেতু নুসরাত জীবনেও বই পড়ে নাই, তাই আমি প্রতিদিন ঐ আইডির টাইমলাইনে বা বিভিন্ন গ্রুপে বই সম্পর্কে পোস্ট দিয়ে জানিয়ে দেই, নুসরাত কত বড় মাপের বইপড়ুয়া।
আরো কত আবেগপ্রবণ পোস্ট দেই, যেমন ‘মেয়ে হয়ে জন্ম নিছি। টাকা কামাতে পারি না তো কী! পিডিএফ পড়েও শত শত বই পড়া যায়। একদিন অনেক টাকা হবে আমার। অনেক বই কিনবো সেদিন।’ সেসব আবেগপ্লুত পোস্ট দেখে নুসরাতের ইনবক্সে মানবতার ঢুল বাজাতে বাজাতে এসে হাজির হোন, ফেসবুকের বই লাভার ওরফে মেয়ে পটানো সিম্প ভাইগুলো। তারা জানিয়ে দেন, বই পড়া এবং বই গিফট দেওয়া তাদের নেশা। এসব কথা বলার সময় আবেগে তাদের গলা বুঁজে আসে।
পরিশিষ্ট : এখন থেকে নুসরাতকে যারা বই গিফট দিতে চাচ্ছে, তাদেরকে নুসরাত বলছে, বই উপহার দিলে যাতে ‘আপনার বইঘর’ নামক বুকশপ থেকে দেয়। ওখানে কালেকশন ভালো। কুরিয়ারও কম রাখে ওরা।
আলহামদুলিল্লাহ অলরেডি দুই ভাই নুসরাতের নামে বই অর্ডার করেছেন। কোনো কুরিয়ার চার্জ না ধরায় উনারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করেছেন। মানে, আমাদের বুকশপ থেকে বই কিনে আমাদেরকেই গিফট করা হচ্ছে। এই বিজনেস লস খাবে কেমনে? আমাদের উন্নতি এখন চোখে পড়ার মতো। দোয়া করবেন সবাই।

হাসান মাহমুদ ইমন
source: https://www.facebook.com/61556672572653/posts/122169144434222419/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

পারস্পরিক শ্রদ্ধা

 বন্ধু প্রথম এলো আমাদের বাড়িতে। আমরা খাচ্ছিলাম আর গল্প করছিলাম। খাওয়া শেষে বন্ধুর কাছে সময় চাইলাম কয়েক মিনিট─ "একটু বোস্‌ রে, আমি প্লেটগুলো পরিষ্কার করে এখনই আসছি কিচেন থেকে।" বলে, প্লেটগুলো হাতে তুলে নিচ্ছিলাম। লক্ষ্য করলাম, বন্ধু বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে! আমার স্ত্রী ততোক্ষণে কিচেনে চলে গেছে।

আমাকে ভদ্রভাবেই জিজ্ঞেস করলো সে অতঃপর─ "স্ত্রীকে সাহায্য করছিস কাজে, দেখে আমার ভালোই লাগছে রে। আমার মূলত ওর কাজে হেল্প করা হয় না, আগ্রহটিই মরে গেছে। শুরুতে কয়দিন করেছিলাম ওর কাজে হেল্প, কিন্তু ধন্যবাদটুকুও দেয় না। শেষবার যখন পুরো মেঝেটা পরিষ্কার করেও কোনো ধন্যবাদ পেলাম না, ওর কাজে হেল্প করা ছেড়েই দিলাম একেবারে।"
বন্ধুটিকে আমি খুব পছন্দ করি। খুব ভালো ছেলে। আমি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না, তাকে এই 'হেল্প' বিষয়ে আমার ভাবনাটি বলা উচিৎ হবে কিনা। কেউ তো কারও চেয়ে কম বোঝে না এই সময়ে! তবু, মনে হলো, এই ভালো ছেলেটি ছোট্ট একটি ভুল ধারণা মস্তিষ্কে পুষে রেখে আসন্ন সুন্দর দাম্পত্য জীবনটিকে জটিল করে তুলছে খুব সম্ভবত। আমি তো বন্ধু ওর, আমার কি উচিৎ নয় তাকে এই ছোটখাটো ভুল ভাবনার বিশাল ও মারাত্মক প্রভাব বিষয়ে একটু সতর্ক করা? আমি দোদুল্যমানতা কাটাতে পারলাম অবশেষে।
প্লেটগুলো টেবিলের একপাশে সরিয়ে রেখে, মুখোমুখি বসলাম আবারও। আশ্বস্তের স্বরে বলতে আরম্ভ করলাম বন্ধুর চোখে চোখ রেখে─
"দোস্তো, আমি স্ত্রীকে 'হেল্প' করছি না। সত্যি বলতে কি─ এই হেল্প-এর তাঁর প্রয়োজনই নেই। তাঁর একজন পার্টনারের প্রয়োজন ছিল জীবনে, দাম্পত্যসাথীর প্রয়োজন ছিল; একারণেই তো আমরা একসাথে আছি। আমি ও সে মিলে, একটি টিম মূলত। আমরা পরস্পরের টিম-মেট। আমি ওর হোম-পার্টনারও, অতএব সংসারের সমস্ত কাজ ভাগাভাগিতে করি আমরা, পার্টনারশিপ-শেয়ারিং-এ। এই ভাগাভাগিকে আমি কিভাবে 'হেল্প' বলতে পারি? এ 'সাহায্য' নয় রে, একে আমরা বলতে পারি─ টিমকে সচল রাখতে টিমের প্রত্যেক সদস্যের একে-অপরকে 'সহযোগিতা' করা, দায়িত্বের ভাগাভাগিতে। 'সাহায্য' ও 'সহযোগিতা' আলাদাই রে, তাই না?
ঘর মোছায় আমি স্ত্রীকে 'সাহায্য' করি না; কারণ এই ঘরে আমিও থাকি, অতএব একে পরিষ্কার আমাকেও করতে হবে। 'সহযোগিতা'।
রান্নায় স্ত্রীকে 'সাহায্য' করি না আমি; কারণ আমিও খাই, আমাকেও রান্নার কাজে যতোটা পারি 'সহযোগিতা' করতে হবে।
খাওয়া শেষে প্লেট ধোওয়ায় ওকে 'হেল্প' করি না আমি; এই প্লেটে আমিও খাই, আমারও দায়িত্ব এই প্লেট পরিষ্কার করা, সহযোগিতা করা।
বাচ্চাদের যে-কোনো কাজে আমি স্ত্রীকে 'হেল্প' করি না; ওরা আমারও সন্তান, ওদের প্রতিটি প্রয়োজনে ভূমিকা রাখা আমার অংশীদারিত্বের মধ্যেও পড়ে। তাহলে?
আমাদের, বাচ্চাদের, জামাকাপড় ধোওয়া, বাজার করা, এই সব ক্ষেত্রেও আমি বলবো, আমরা পরস্পরকে 'সাহায্য' করি না; আমরা পারস্পরিক 'সহযোগিতা'য় সংসার-টিমটিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি।
আমি 'সাহায্যের হাত' বাড়িয়ে দেই না আমাদের সংসারের কোনো কাজে, আমি এই সংসারেরই একটি অংশ হিসেবে নিজের দায়িত্বটিই সম্পাদন করি।
বন্ধু, সংসারের বাইরেও আমরা উভয়ে যার-যার মতো এইযে কাজ করছি, উপার্জন করছি, এ তো এই সংসারের জন্যই। তো, আমাদের ওই কাজের পরে, এই সংসারের মধ্যেও তো আমাদের যার-যার কাজ রয়েছে দায়িত্বে! আমি এভাবেই ভাবি রে!"
আমার বন্ধুটি আহত হলো না এসব কথায়। সে মনোযোগ দিয়ে শুনলো সমস্তটা। তার আগ্রহ লক্ষ্য করে, এ পর্যায়ে আমি ভদ্রতার সাথেই জানতে চাইলাম─ "সর্বশেষ কবে তুই, স্ত্রীর ঘর মোছা, রান্না করে খাওয়ানো, বাজার করা, বাচ্চাদের পড়াশোনা করানো, কাপড় ধোওয়া, এমনকি বেডশিট পাল্টানোর জন্য, তাঁকে ধন্যবাদ দিয়েছিস?"
বন্ধু চুপ হয়েই রইলো।
─ "ধন্যবাদ আমরা দেই না স্ত্রীদেরকে, তো আমরা কিভাবে আশা করছি তাঁদের কাছ থেকে 'ধন্যবাদ'?
আমাদের পাঠ্যবই, আমাদের সমাজ, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের নিজেদের পেশিশক্তির গৌরব, এইসবই আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে এই বীভৎস ভ্রান্ত ধারণাটি ঢুকিয়ে দিয়েছে, যে─ ঘরোয়া কাজ মেয়েলি; এসব করবে মেয়েরাই। এসব করলে আমাদের জাত যাবে। আমরা সেরা প্রজাতি, ওরা তো দ্বিতীয়-লিঙ্গ মাত্র! এই ভাবনাই আমাদের সংসারে ফাটল ধরার, সংসারের মুখ থুবড়ে পড়ার, অন্যের সংসারের উন্নতি দেখে পরশ্রীকাতর হওয়ার, মূল কারণ দোস্তো। এই কুৎসিত ভাবনার সবচেয়ে বড়ো ক্ষতিটি হলো─ আমরা এই ভাবনাটি আমাদের সন্তানদের মাথায়ও ঢুকিয়ে দিচ্ছি প্রতিনিয়ত; ফলে আমাদের সন্তানরা হয়ে উঠছে সংসারবিমুখ, নারীর প্রতি মর্যাদাবোধহীন; এর প্রতিক্রিয়ায় নারীরাও হয়ে উঠছে এরকম ছেলেদের প্রতি বিরক্ত ও সম্মানবোধহীন, এমনকি আমাদের পুত্ররা এরকম অসভ্য ধারণার কারণেই মূলত হয়ে উঠছে নির্যাতনকারী, রেইপিস্ট। আয়, আমরা পরিবার থেকেই আরম্ভ করি; এভাবে আমাদের সন্তানেরা গড়ে উঠবে সুস্থ মানসিকতার মানুষ হয়ে একেকজন, ওরা গড়ে তুলবে সুস্থ সমাজ; এভাবেই তৈরি হোক একটি পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ অপরূপ মানবজাতি। পৃথিবীটা সুন্দর হোক।"
Salah Uddin Ahmed Jewel

source: https://www.facebook.com/100011467223962/posts/2331085307283687/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

Friday, May 31, 2024

সিরিয়াস বাবা

 আমাদের সিরিয়াস বাবা ঘরে ফিরতো রাত সাড়ে দশটায়। বাবা আসার আগ অবধি ঘর টা থাকতো আমাদের রাজ্য। যে যেমন মন চায় করতাম। উচ্চ স্বরে কথা বলা৷ হাসতে হাসতে খিল ধরতো ভাই বোন দের। মাও জোরেই চিল্লাচিল্লি করতো আমাদের।

বাবা ঘরে ঢুকতো সাড়ে দশটায়। সাথে বাজারের থলে। শীতকাল হলে নানা সবজি, ফুলকপি বেগুন, শীম। আর ছোট ছোট নানা রকমের মাছে একটা মিক্স মাছ আনতো। মাছটা মা কাঁচা মরিচ দিয়ে রান্না করতো অদ্ভুত এক সুঘ্রাণ আসতো। মোটা চালের ভাত টা অনায়সে গ্রো-গ্রাসে চলে যেত।
বাবা ঘরে ঢুকলে সব শান্ত হয়ে যেত। বাবা ঘরে ঢুকলে নাকে আসতো, বাবার গায়ে থাকতো তীব্র সিগারেটের গন্ধ। গলির মোড়েই খেয়ে আসত বাবা। আর সারাদিনের ক্লান্ত ঘাম। অদ্ভুত এক গন্ধ। আমার কাছে বাবার পরিচিত কিছু যদি থাকতো তা হলো বাবার সে গায়ের গন্ধ টা৷ সারাজীবনে এই গন্ধ টার মতো পরিচিত কিছুই হয় নি আমার আর।
ছোট থেকে দেখে আসা বাবা সস্তা সেই ডোরা কাটা, দাড়ি দাড়ি কয়েক টা শার্ট।যা কলার গুলো পরিস্কার করতে করতে রোজ প্রায় নরম হয়ে চামড়া উঠে গিয়েছিলো।
তিন টা ফরমাল প্যান্ট। বাবার জিনিস বলতে এইসবেই পরিচিত ছিল আমার।
পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। যখন ক্লাস নাইনে উঠি তখন থেকে বাবাকে আমি এইভাবে খেয়াল করতে থাকি। বড় আপু,তার পর দুই ভাই, এরপর ছোট আপু আর এরপর আমি।
আমি বাবার কোলে উঠে আবদার করে পাশে বসেছি এমন কোন স্মৃতি আমার ছিলো না।
আমি মাঝেমধ্যে ভাইয়া আর আপুদের জিজ্ঞেস করতাম তোমার বাবার সাথে কখনো বসে আদর পাও নি?
ভাইয়া হাসতো, এইসব রূপকথার গল্প আসেও কেমনে তোর মাথায়?
বড় আপু রাবেয়া, ধমক দিতো।
-কেন করবে না? বাবা অফিস থেকে ফিরে প্রায় তো কোলে নিয়ে বসতো। তুই তো বাবার কোলে বসে থাকতি বাবার থাল থেকে একটা একটা ভাত খেতি। আর একবার তো বাবার কোলেই খাওয়ার সময় পটি করে দিয়েছিলি৷
বলতে বলতেই ওরা খিলখিল করে হাসে। রাবেয়া আপু আর রুবিয়া আপু।দুজনেই সারাদিন খিল খিল করে হাসে। তাদের ঢেউ ভাঙ্গা চুল গুলো সামনের দিকে চলে আসে। হাসতে হাসতে পেছন নিয়ে যায় এক হাতে অন্য হাতে উড়না টেনে আরেকটু গলার সাথে পেঁচায়।
ওদের মরিচা রঙের গায়ের রং, না ফর্সা না কালো। না সাদা না হলুদ এমন দাত গুলো বের হয়ে আসে।
আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি।
ভাইয়াদের সাথে কখনো সখনো খাওয়া হয়। তখন খুব মজা হয় আমাদের। সাব্বির ভাইয়া রুবিয়া আপুকে সারাক্ষন বিরক্ত করে। রাবেয়া আপু শান্ত হলেও রুবিয়া আপু ভীষণ মারকাটুরে।
কোন কথায় সে ফেলে না। কথায় না পারলে মাকে বিচার দেবে। মা তার মাথার উপর তোলা কানের পেছনে গুজে রাখা উড়নাটা খুলে আবার গুজে কানের দিকে। মায়ের সোনার বড় রিং কানের দুল টা নড়ে৷ মা হাল্কা চেঁচিয়ে বলবে,
- আহ, এত বড় ছেলে এইসব কি করিস খাওয়ার সময়?
ভাইয়ার এইসবে কিছু হয় না। রুবিয়া আপু উঠে ভাইয়ার পিঠে ধুম করে আবার কিল লাগায়।
ভাইয়া ওর চুল টেনে দেয়ে এঁটো হাতে। সে ফ্লোরে পা বারি দিয়ে কান্না করে। মেজ ভাইয়া আরেকটা বেনী টান দেয় এঁটো হাতে। মা বকতে গিয়ে হেসে দেয়। রুবিয়া আপু ভাত খাওয়ার সময় হাত ধোঁয়ার সময় যে গামলা টা দেওয়া হতো সবাই এঁটো ফেলতো সে গামলায় হাত ডুবিয়ে দুই হাত ওদের শার্টে মুছে দৌঁড় দিতো। ওর পাড়ার দোকান থেকে কেনা সস্তা নূপুর টা ঝুনঝুন করতো।
এইসব কোন কিছুই আমার বাবার দেখা হয় নি। এইসব মজার খাওয়ায় সময় টাতে আমি কখনো বাবাকে দেখি নি।
বাবা যখন বাড়ি ফিরতো আমাদের সবার প্রায় খাওয়া শেষ৷ সবাই একেবারে চুপচাপ। মাও ধীরে কথা বলতো। ধীরে হাটতো। আপুদের কথা গুলো ভলিউম বিহীন হতো।
বাবা যেদিকে থাকতো ভাইয়ারা সেদিকে পা দিতো না। বিরক্তি টেনে অন্য দিকে যেতো৷
মা বসে থাকতো। বাবার সাথে খেতে বসতো। মা ভাতের হাঁড়ির পাশে পিরা নিয়ে বসতো। আমাদের সেমি পাকা সিমেন্ট উঠে যাওয়া এ্যাশ কালারের ফ্লোরে একটা সাদা চালের বস্তা বিছানো থাকতো। বাবা মাদুরে বসতো। বাবার পাতে তরকারি তুলে দিতো মা । বাবা মায়ের সাথে হাল্কা কথা বলতো। আসলে মায়েই বলে যেত বাবা শুধু হু-হু করতো।
আমাদের সারাদিনের ফারমাশেয় যা মাকে বলে বলে আমরা বিরক্ত করে ফেলি, মা বিরক্তি নিয়ে চেঁচিয়ে উঠতো। সেগুলো মা আবার আস্তে আস্তে বলতো বাবাকে। কার স্কুলের বেতন দিতে হবে, কার টিউশনের ফি লাগবে,কার মডেল টেস্টের টাকা লাগবে, এইসব মা বলতো। কার জুতা লাগবে। নতুন ড্রেস লাগবে।
মা আস্তে আস্তে বলতো।
সামনে কারো বিয়ে থাকলে,কেউ বেড়াতে আসবে বললে।
মোট কথা সব খরচের একটা সামারি থাকতো, খুব সফট ভয়েসে।
প্রতিদিন বলতে পারতো না। কোন কোন দিন বাবা বিরক্তি নিয়ে, " আহ! " বলে উঠতো। সেদিন মা একেবারেই চুপ।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে আপুরা ইশারা করতো বলার জন্য। মা মাথা নাড়তো। চোখ বড় করে সড়ে যেত বলতো।
বেতন -ফি এইসব মাকে দিয়ে গেলেও। জুতা, শার্ট এইসবের জন্য বাবাকে দেখাতে হতো। আসলেই লাগবে কিনা?
বাবা খাবার শেষে এককাপ গরম দুধ খেত। তার সে বেতের চেয়ারে। পা তুলে বসতো। আমাদের যাদের যা লাগবে তা বাবার সামনে বলতে হতো৷
ব্যাগ বা স্যান্ডেল লাগলে তা ছিড়ে গেলে তা আগে দেখাতে হবে। বাবা যদি বলতো আরো কিছুদিন চলবে তাহলে আমাদের আর্জি সেখানেই শেষ হতো। মা চোখ টিপতো।
যার অর্থ, এখন যা। আমি দেখছি।
বাবা সকালে আটটায় বের হতো। বাবা বের হয়ে গেলে আবারো আমাদের ছন্দে চলতো ঘর। মায়ের হাকডাক। বোনেদের উচ্চস্বরে হাসি।
হঠাৎ আমার মনে হতো বাবা কি সারাজীবনেই এমন? আমাদের মতো মজা করা,হাসি তামশা, এইসব কি কিছুই ছিলো না বাবা? করতো না? বাবার কোন বন্ধুও ছিলো না?
একে একে বোনেদের বিয়ে হয়ে গেল।বোন দের বিয়েতেও বাবার কোন উচ্ছ্বাস ছিলো না। কেমন যেন সেই পরিচিত চিন্তিত আর গম্ভীর মুখ।
একটা পুরানো আয়রণ করা সুতি পাঞ্জাবিতেই বাবার বোনদের বিয়ে পার করে ফেলে। ক্লাবে আমরা যখন হাসিতে, খুশিতে, ছবিতে, নাচানাচিতে ছিলাম। বাবাকে ধরে আনা হয় রান্না ঘরে বাবুর্চির সাথে ঝগড়া করার সময়।
মায়ের সাথে সবার ছবি তোলার ধুম। বাবার কথা, বাবার সাথে ছবি তোলার কথা কারো মনেই নেই।
শুধু মা আলতো করে বলল,
- বিয়ে তো শেষ তোর বাবাকে একটা ছবি তোলার জন্য ডাক কেউ।
ভাইয়ারা বা বোন কেউ কোন আগ্রহ দেখাল না। মাও যেন আবার ভুলে গেল।
আমি ভয়ে ভয়ে গেলাম রান্নাঘরে।
বাবাকে ডাকলাম,
- মা ডাকছিলো, একটা ছবি তুলতে।
বাবা সাথে সাথে কোন উত্তর না দিলেও বাবুর্চিকে বকাবকি শেষ করে আমাকে আলতো করে বলল,
- বেশি ক্ষন থাকতে পারব না। ধুম করে লুকিয়ে ফেলবে জিনিস। চল।
বাবা স্টেজে উঠায় সবাই নেমে গেল। আপু ডেকে সবাইকে তুলল আবার।
সবার ছোট হওয়ায় বাবার রানের উপর আমাকে বসানো হলো। মা পাশে বসল। রুবিয়া আপু পেছনে দাড়াঁল ভাইয়ারা নিচে হাটু ভেঙে। যাতে সবাই এক ফ্রেমে সুন্দর করে আসে।
আমি ভয়ে ভয়ে বসেছিলাম। হঠাৎ বাবা আলতো করে ধরলো আমায়। পিঠে হাত বুলালেন।।আমি স্পর্শ করলাম প্রথম বার বাবার স্পর্শ ত্বকে নয় বুকের ভেতরে কোন একটা দেওয়ালে গিয়ে ধাক্কা লাগায়। কাঁপুনি ছুটায়।
এরপর সবাই আবার মেতে উঠলো মজায়। বাবা ফিরে গেল আবার রান্নাঘরে বাবুর্চি পাহারা দিতে।
সেদিন আমার প্রথম বার মনে হলো আমাদের বেড়ে উঠা, আমাদের জীবন, আমাদের পড়ালেখা, আমাদের এই আনন্দ, নতুন জামা। সব তো বাবার টাকায়৷ বাবার জন্য৷
কিন্তু আমাদের আনন্দে কোন ভাগীদারেই যেন তিনি নেই। তিনি নন।
এক বুক হাহাকার সেদিন বুকে জেগে উঠেছিলো বলে আমি বোধহয় শেষ অবধি ছাড়তে পারি নি বাবাকে। কি যেন একটা উলের কাটার মতো ফুটতো৷
আপুদের বিয়ে হয়ে গেল। ভাইয়ারা কেউ সিলেট কেউ কক্সবাজার চলে গেল চাকরি নিয়ে। বিয়ে করে যে যার বউ নিয়ে।
আমাদের ঘর আবার ঠান্ডা আর নিশ্চুপ হয়ে গেল। কিন্তু সেটা বাবার জন্য না। তখন সবে আমার ইন্টার শেষ করে ভার্সিটি লাইফ শুরু হচ্ছিল। বাবা রিটায়ার্ড হলো।
বাবার আর ফেরার টাইম নেই। বাবা ঢুকলে সব থমকে যাচ্ছে না। বোনেরা ভাইয়েরা এলে প্রথম প্রথম আগের মতো বাবার সামনে চুপ থাকার চেষ্টা করলেও ধীরে ধীরে সব কমতে শুরু করলো।
''বাবা আছে, তো কি হয়েছে?'' সবার মধ্যে এমন একটা ভাব আসা শুরু করলো।
আমাদের কথাবার্তা।হাসি মজা করা বাবা দূর থেকে অবাক চোখে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেল৷
আমরাও অভ্যস্ত হয়ে গেলাম বাবার থাকাটা।
বাবার নিস্পৃহ চাহনী ভেজা শমুকের মতো ধীর হতে লাগলো৷
আমি বাবার সে দাপট চলা কে মিস করতে করতে এক সময় সেটা মায়ায় পরিণত হলো৷ তখন আমিই শুধু বাবাকে আগের মতো সম্মান দিয়ে চলতাম।
বাবা ধীরে ধীরে মিশতে চাইছিলো আমাদের জগতে৷ যে জগতে যিনি কোন কালেই ছিলেন না। তিনি ছিলো রাত সাড়ে দশ টা থেকে সকাল আটটার একজন অথিতি মাত্র।।যাকে সবাই ভয় পেতাম। মাও এখন ভয় পায় না। আমাদের বাসা চেঞ্জ হলো। সেই স্যাতস্যাতে ফ্লোরে এখন চকচকে। মা আর কাজ করে না। কাজের মেয়ে একটা আছে।যাকে তদরাকি করা আর ওর না পারার কাজের ফর্দ শোনায় মূল জীবনে পরিণত হয়েছে।
আমরা এখনো আমাদের সিরিয়াস বাবাকে কোন প্লানে ইনভলব করতে ভুলে যায়। ভাইয়েরা বোনেরা বাড়িতে এলে পার্কে ঘুরতে যাওয়া প্লান হয়। সবাই যখন ঘুরে এলাম মা সহ। বাবা পাড়ার দোকান থেকে ফিরে এসে বলল,
-কোথায় গিয়েছিলে সবাই?
- পার্কে!
বাবা তার চামড়ার জুতো গুলো দরজার পাশে দেওয়ালে হাতের হেলান দিয়ে খুলতে খুলতে বলে,
- কই বললি না তো কেউ। আমাকেও বলতি, আমিও ঘুরে আসতাম।
মা বলে উঠলো, তুমি যাবে না তাই।
বাবা ' ও' বলে তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছোট মোবাইল টা শোকেসের পাশে রেখে ভেতরে চলে গেল।
আমরা খেয়াল করলাম, বাবা যাবে না এইটা আমরা এমন ভাবে গেঁথে নিয়েছি বাবাকে যাওয়ার জন্য বলার কথা কারো মাথায় এলো না। কারণ বাবা যে আমাদের সিরিয়াস বাবা।
যার এই সংসারে অথিতি হওয়াটা আমাদের জন্যেই ছিলো। সকালে বের হতে রাতে ফিরতো বলে নির্ধিদায় বোনেদের বিয়ে হয়েছে আর পূরণ হয়েছে সব ভাইয়ের পরীক্ষার ফরম।
তারপর একদিন কোন কারণ ছাড়া মা মারা গেল। সবাই বলতে লাগল, আহারে সুখের সময় মরে গেল।
আমি ভাবতাম, মা কি অসুখী ছিলো?
আমাদের পাঁচ ভাইবোন নিয়ে। বাবাকে নিচু স্বরে আমাদের ফরমায়েশ গুলো দেওয়াতে তো মা সংসার খুঁজে নিয়েছিলো৷ মা তো অসুখী ছিলো না৷ মা তার সন্তানদের আদর পেয়েছি। তার সন্তান দের দুনিয়ায় বিশাল একটা জায়গা নিয়ে রেখেছিলো। মায়ের সাথে আলোচনা হতো, তর্ক হতো, সিদ্ধান্ত হতো।
মা জিতে গিয়েছিল। এই ক্ষেত্রে হেরে গিয়েছিল বাবা। কারো দুনিয়ায় কোন জায়গা করতে না পেরে।
আমি আর বাবাই রয়ে গেলাম বাসায়। বাবার পাশে গিয়ে বসে গল্প করা, হাসতে হাসতে খেলা দেখা, সারাদিন কি করেছি এসে বলার ছোটবেলার তীব্র ইচ্ছাটা তখনো কেমন যেন তুষের আগুনের মতো জ্বলতো।
কিন্তু, খাবার খেয়েছেন? আর ওষুধ খেয়েছেন? ওষুধ লাগলে বলিয়েন। এই চক্রে আমি আটকে গেলাম। কোন দ্বার আমি ভাঙ্গতে পারছিলাম না।
একদিন বন্ধুদের সাথে খেলা না দেখে ফিরে এলাম ঘরে। টিভি ছেড়ে বাবাকে ডাকলাম,
- খেলা দেখবেন?
বাবা এক গাল হেসে,
- দেয়, দেখি।
বলে পাশে এসে বসলো।
কাজের মেয়েটাকে বলে মুড়ি মাখিয়ে নিলাম। বাবার সাথে এই বাটি থেকে খাবো ভাবতে পারি নি কখনো।
খেলার উত্তেজনায় যখন চিৎকার করে উঠি, ভয়ে আবার চুপ হয়ে যায়।
বাবা কোন কথা বলে না। যেন খুশিই হয়।
ধীরে ধীরে আমার সিরিয়াস বাবা আমাদের খেলা দেখার পার্টনার হয়ে যায়।
দুজনে চিৎকার করে উঠি। আমার ভয় কাটে৷ বাবার স্পর্শ পেলে আর কেঁপে উঠি না। দুইজন দুইদলের হয়ে ঝগড়া করি।
আমার কাছে যা রূপকথার গল্পের চেয়ে কম নয়।
অফিসে সবাইকে পিজ্জা দেওয়া হয়। আমার টা বাসায় নিয়ে আসি। খেলা দেখার সময় আমি বের করে খেতে নিই। বাবাকে বলি, খাবেন?
বাবা অবাক চোখে বলে,।
-এইটা কি জিনিস, দেয় খেয়ে দেখি।
খেয়ে বলল।
- মজা তো। আগে তো খাই নি।
আমি অবাক হলাম, আমরা ভাই বোনেরা পিজ্জা খেয়েছি অনেক আগে থেকে। মাও খেতো৷ কিন্তু বাবা ফেরার আগে। আশ্চর্য কখনো বাবাকে খাওয়ানো হয় নি। কারণ বাবা তো আমাদের সিরিয়াস বাবা ছিলো৷ আমার বুকে আবার ফুটলো উলের কাটা।
একটা লেদার জ্যাকেট কিনে আনলাম। বাবাকে দেখালাম। বেশ গম্ভীর গলায় বাবা সব দিকে ঘুরিয়ে দেখে বলল,
-দাম কত নিলো?
দাম বলার পর অবাক স্বরে তাকিয়ে বলল,
-এত টাকা দিয়ে এইসব কেনার সাহস হয় কি করে তোদের?
আমি জানি আমাদের সবার সিনিয়াস বাবা কাপড় চোপড়ের মতো তুচ্ছ জিনিসে খরচ করার সাহস করতো না।
বাবা তারপর হাতে দিয়ে বলল, তবে ঠান্ডা লাগবে না। বাইক চালাস তো। আমি তো শীতের সময় যখন ফিরতাম বুকের উপর শক্ত ঢাল দিতাম ঠান্ডা না লাগার জন্য।
আমি জানি,সে কথা। তবে আর উচ্চারণ করলাম না। সাহস হলো না৷ বাবার হাতে জ্যাকেট টা দিয়ে আলতো করে বললাম,
-এইটা আপনার জন্য। পরে দেখেন। ফিটিং হয় কিনা? না হলে চেঞ্জ করে আনব।
বাবা অবাক চোখে তাকালেন আবার৷ অবিশ্বাস্য চোখে। বিশ্বাস হচ্ছে না উনার।
আমি একটু জোরেই বললাম, পরে দেখেন নইলে চেঞ্জ করে আনি৷
উনি পরে দেখলেন।
ড্রয়িং রুমে আয়না আছে তাও উনি বেশ তাড়াতাড়ি করে উনার রুমের দিকে যেতে যেতে বললেন,
-দাঁড়া আয়না দেখে আসি।
তখন না বুঝলেও পরে বুঝেছি। বাবা কেন পালিয়ে গেল সামনে থেকে।অনেকক্ষন পর স্বাভাবিক হয়ে ফিরে বলল,
- কত্ত আরাম রে খোকা এইটা। ভেতরে পুরো গরম উম।
বাবা নাকি ছোট বেলায় আমায় খোকা ডাকতো। বুদ্ধির পর এই প্রথম শুনলাম।
বাবাকে বললাম,
-চলেন আজ বাইকে করে ঘুরে আসি।
বাবা যেন চোখেমুখে বাচ্চাদের উচ্ছ্বাস দেখালো আমায়। বাবা সারাজীবন বাইক চালিয়েছে। বাবাকে প্রথম বাইকের পেছনে বসাতে ভয়েই লাগছিলো আমার।
বাবা আমার পেছনে বসলেই আমি দূরত্বে ছিলাম। হঠাৎ কাঁধে হাত দিয়ে ধরল বাবা। সেই বুকের দেওয়ালে ধাক্কা দেওয়ার মতো অনুভূতি টা। বাবা ধীরে আমার পিঠ ঘেঁসে বসলো।
কাঁপা স্বরে বাবা বলে উঠলো,
-তোকে কখনো আমার বাইকের পেছনে বসিয়ে ঘুরতে নিই নি, তাই না রে খোকা?
আমি জানি না কি ছিলো সে কথায়। অঝোরে ঝড়ছিল আমার চোখ বেয়ে পানি। রাস্তার তীব্র ঠান্ডা বাতাস সে কান্নায় বাতাস লাগিয়ে শীতল করছিল চেহেরাটা যেন জমে যাচ্ছে বরফ, উড়ে যাচ্ছে পানি গুলো।
হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার পেছনে ঘাড়ের দিকে কিছু অংশের শার্টটা কেমন যেন ভেজা ভেজা লাগছে।
আমি নিঃশব্দে বাবার মনের শব্দ গুলো শুনছিলাম। যেসব বাবারা সন্তানের জীবন বানাতে নিজের জীবন হারিয়ে হয়ে যায় সিরিয়াস বাবা।

source: https://www.facebook.com/61555758508424/posts/122126293706191950/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

আমেরিকান সিটিজেনশিপ দিয়ে আমি কী করব?

  এই জীবনে বেশির ভাগ কাজই আমি করেছি ঝোঁকের মাথায়। হঠাৎ একটা ইচ্ছে হলো, কোনো দিকে না তাকিয়ে ইচ্ছাটাকে সম্মান দিলাম। পরে যা হবার হবে। দু-এ...