Saturday, December 14, 2024

যে জলে আগুন জ্বলে

 "হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি নয়তো গিয়েছি হেরে,

থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতা কে কাকে গেলাম ছেড়ে!"
হেলাল হাফিজ। কবি। একটিমাত্র বই লিখেছেন পুরোটা জীবনে (পরবর্তী বইটি এর বর্ধিত সংস্করণ মাত্র, এবং, দীর্ঘ ৩৪ বছর পরের তৃতীয়টিকে বলা যায় অণুকাব্য-সংকলন)। ছাপ্পান্নটি কবিতায় গড়া ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বইটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পঠিত কাব্যগ্রন্থ, আজও। বইটি তিনি হৃদয়ে ক্ষত ধরে লিখেছিলেন। বইটির অধিকাংশ পঙক্তি লাখেলাখে বাঙালি তরুণতরুণীর মুখস্থ। কেন? বিরহী হেলাল হাফিজ জীবনে আর বিয়েই করলেন না বলে? না। কবিতাগুলোর প্রতিটি বর্ণের ভিতরে, তাঁর হেলেনের জন্য মেখে থাকা হৃদয়ের দাগ গেঁথে দিতে, পেরেছিলেন বলেই। অন্য ঘরে বিয়ে হয়ে যাওয়া হেলেনকে, তাঁর স্বামী যখন, হেলাল হাফিজের 'যে জলে আগুন জ্বলে' কাব্যগ্রন্থটির উৎসর্গ অংশটি দেখালেন, বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠেছিলো তরুণীর! সেই-যে তাঁর মস্তিষ্কে সমস্যা দেখা দিলো, মারা গেলেন সেভাবেই, পায়ে শেকল পরা অবস্থায়, হেলেন। বাংলা সাহিত্য কাঁপিয়ে দেওয়া বইটির উৎসর্গপত্রে লিখা আছে, কেবল, একটি নীলাভ অক্ষর─ 'হেলেন'। মানুষের বুকের ভিতরের দাগ বড্ড দুখী। বড্ড দুখী। দাগটির নাম─ ভালোবাসা।
"ইচ্ছে ছিল তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো,
ইচ্ছে ছিল তোমাকেই সুখের পতাকা করে
শান্তির কপোত করে হৃদয়ে ওড়াবো।
ইচ্ছে ছিল সুনিপুণ মেকাপ-ম্যানের মতো সূর্যালোকে কেবল সাজাবো,
তিমিরের সারাবেলা
পৌরুষের প্রেম দিয়ে তোমাকে বাজাবো, আহা তুমুল বাজাবো!
ইচ্ছে ছিল নদীর বক্ষ থেকে জলে-জলে শব্দ তুলে
রাখবো তোমার লাজুক দুই চঞ্চুতে,
জন্মাবধি আমার শীতল চোখ
তাপ নেবে তোমার দু’চোখের।
ইচ্ছে ছিল রাজা হবো─
তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো,
আজ দেখি─
রাজ্য আছে
রাজা আছে
ইচ্ছে আছে,
শুধু তুমি অন্য ঘরে।"
─ 'ইচ্ছে ছিল' (যে জলে আগুন জ্বলে, ১৯৮৬)
বলছিলাম 'যে জলে আগুন জ্বলে' নিয়ে। বাংলায় এমন কোনো সাহিত্যপ্রেমী নেই, যিনি এ-গ্রন্থের অন্তত একটি ছত্র আওড়াননি জীবনে! যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রেমাঙ্গন, আটপৌরে উঠোন থেকে প্রেয়সীর দীর্ঘশ্বাস, সাম্রাজ্যবাদ থেকে সাম্যবাদ, কী নেই এ-কবিতাগুলোর ছত্রে-ছত্রে!
'নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়' কবিতার─ "এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।" কিংবা, 'ব্যবধান' কবিতার─ "অতো বেশি নিকটে এসো না, তুমি পুড়ে যাবে!" 'হৃদয়ের ঋণ' কবিতার─ "আমার জীবন ভালোবাসাহীন গেলে, কলঙ্ক হবে কলঙ্ক হবে তোর।' অথবা, 'অশ্লীল সভ্যতা' নামক মাত্র ৬ শব্দের অপূর্ব পুরো কবিতাটি: "নিউট্রন বোমা বোঝো, মানুষ বোঝো না!" 'অমীমাংসিত সন্ধি' কবিতাটিতে পাবেন অদ্ভুত অবসেশনে নারীপ্রেম! যদি বিস্ময়কর একটি হৃদয়ভাঙা কবিতা পড়তে চান, নির্দ্বিধায় ডুবে যান উপরোল্লিখিত 'ইচ্ছে ছিল' কবিতাটায়। যদি আমৃত্যু মনে রাখার মতো একটি কবিতা পড়তে চান, 'প্রস্থান' কবিতাটি একবার পড়ুন জীবনে─
"এখন তুমি কোথায় আছ কেমন আছ, পত্র দিয়ো৷
এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালী তাল পাখাটা
খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিয়ো৷
ক্যালেন্ডারের কোন্ পাতাটা আমার মতো খুব ব্যথিত
ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে তোমার দিকে, পত্র দিয়ো৷
কোন্ কথাটা অষ্টপ্রহর কেবল বাজে মনের কানে
কোন্ স্মৃতিটা উস্কানি দেয় ভাসতে বলে প্রেমের বানে
পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো৷
আর না-হলে যত্ন করে ভুলেই যেয়ো, আপত্তি নেই৷
গিয়ে থাকলে আমার গেছে, কার কী তাতে?
আমি না-হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি ভুল করেছি,
নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে
পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?
এক জীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,
এক মানবী কতোটা আর কষ্ট দেবে!"
─ 'প্রস্থান' (যে জলে আগুন জ্বলে, ১৯৮৬)
আপনি হৃৎমন্থনে বিবশ হয়ে যেতে চাইলে পড়তে পারেন নিম্নোল্লিখিত 'যাতায়াত' কবিতাটি─
"কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো!
কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না,
রাত কাটে তো ভোর দেখি না,
কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না, কেউ জানে না!
নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম,
পেছন থেকে কেউ বলেনি─ করুণ পথিক
দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিয়ো;
কেই বলেনি─ ভালো থেকো সুখেই থেকো।
যুগল চোখের জলের ভাষায় আসার সময় কেউ বলেনি─
মাথার কসম আবার এসো।
জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো,
শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক;
চৈত্রাগুনে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি,
বললো না কেউ─ তরুণ তাপস এই নে চারু শীতল কলস।
লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলাম, তবু এলাম।
ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়
আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই দুঃসময়ে এতোটা পথ একলা এলাম শুশ্রূষাহীন।
কেউ ডাকেনি তবু এলাম, বলতে এলাম─ ভালোবাসি।"
─ 'যাতায়াত' (যে জলে আগুন জ্বলে, ১৯৮৬)
যদি বাংলা সাহিত্যের একটি অমর কবিতায় ঋদ্ধ হতে চান, পড়ুন 'ফেরিঅলা'─
"কষ্ট নেবে কষ্ট?
হরেক রকম কষ্ট আছে,
কষ্ট নেবে কষ্ট!
লাল কষ্ট, নীল কষ্ট, কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট,
পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট,
আলোর মাঝে কালোর কষ্ট,
‘মাল্টি-কালার’ কষ্ট আছে,
কষ্ট নেবে কষ্ট?
ঘরের কষ্ট, পরের কষ্ট, পাখি এবং পাতার কষ্ট,
দাড়ির কষ্ট,
চোখের বুকের নখের কষ্ট,
একটি মানুষ খুব নীরবে নষ্ট হবার কষ্ট আছে,
কষ্ট নেবে কষ্ট?
প্রেমের কষ্ট, ঘৃণার কষ্ট, নদী এবং নারীর কষ্ট,
অনাদর ও অবহেলার তুমুল কষ্ট,
ভুল রমণী ভালোবাসার
ভুল নেতাদের জনসভার
হাইড্রোজনে দুইটি জোকার নষ্ট হবার কষ্ট আছে,
কষ্ট নেবে কষ্ট?
দিনের কষ্ট, রাতের কষ্ট,
পথের এবং পায়ের কষ্ট,
অসাধারণ করুণ চারু কষ্ট, ফেরিঅলার কষ্ট,
কষ্ট নেবে কষ্ট?
আর কে দেবে আমি ছাড়া আসল শোভন কষ্ট,
কার পুড়েছে জন্ম থেকে কপাল এমন,
আমার মতো ক’জনের আর সব হয়েছে নষ্ট,
আর কে দেবে আমার মতো হৃষ্টপুষ্ট কষ্ট!"
─ 'ফেরিঅলা' (যে জলে আগুন জ্বলে, ১৯৮৬)
যুদ্ধ-পরবর্তী গণতন্ত্রে, প্রবঞ্চিত সাম্যবাদের জন্য আকুতি পাবেন আপনি 'একটি পতাকা পেলে' কবিতাটিতে─
"কথা ছিল একটি পতাকা পেলে
আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা।
কথা ছিল একটি পতাকা পেলে
ভজন গায়িকা সেই সন্ন্যাসিনী সবিতা মিস্ট্রেস
ব্যর্থ চল্লিশে বসে বলবেন─ ’পেয়েছি, পেয়েছি!’
কথা ছিল একটি পতাকা পেলে
পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের সকালে
ওম নেবে জাতীয় সংগীত শুনে পাতার মর্মরে।
কথা ছিল একটি পতাকা পেলে
ভূমিহীন মনুমিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে-বোশেখে,
বাঁচবে যুদ্ধের শিশু সসম্মানে সাদা দুধে-ভাতে।
কথা ছিল একটি পতাকা পেলে
আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে,
সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ
সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।"
─ 'একটি পতাকা পেলে' (যে জলে আগুন জ্বলে, ১৯৮৬)
হেলাল হাফিজ বলেছিলেন, "'যে জলে আগুন জ্বলে' লিখে আমি আর কোনো কবিতা লিখিনি একটিই কারণে─ আমি প্রায় নিশ্চিত ছিলাম, এমন কবিতা আমি লিখতে পারবো না আর কখনোই।"
প্রিয় হেলেন, একটি মানুষ, আপনাকে ভুলতে পারলেন না তাঁর ইহজনমে, আপনি কি জানেন? হেলেন, আজ, বেলা ২:৪০ মিনিটে, ঢাকার পিজি হাসপাতালে এই জনম ত্যাগ করলেন, আপনার হেলাল। আপনাদের দেখা হোক ওইপারে, আপনাদের অন্তত একটিবার দেখা হোক জীবনের ওইপারে।
ওপারে ভালো থাকুন হেলেনের হেলাল।
হায়! "দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ।"

No comments:

Post a Comment

আমেরিকান সিটিজেনশিপ দিয়ে আমি কী করব?

  এই জীবনে বেশির ভাগ কাজই আমি করেছি ঝোঁকের মাথায়। হঠাৎ একটা ইচ্ছে হলো, কোনো দিকে না তাকিয়ে ইচ্ছাটাকে সম্মান দিলাম। পরে যা হবার হবে। দু-এ...