Saturday, September 7, 2024

বাবা, একটা ক্রেডিট কার্ড

 রাগ করেই ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। এতটাই রেগে ছিলাম যে বাবার জুতোটা পড়েই বেরিয়ে এসেছি। বাইক ই যদি কিনে দিতে পারবেনা, তাহলে ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবার সখ কেন.? হঠাৎ মনে হল পায়ে খুব লাগছে। জুতোটা খুলে দেখি একটা পিন উঠে আছে। পা দিয়ে একটু রক্তও বেরিয়েছে। তাও চলতে থাকলাম। এবার পাটা ভিজে ভিজে লাগল। দেখি পুরো রাস্তাটায় জল। পা তুলে দেখি জুতোর নিচটা পুরো নষ্ট হয়ে গেছে। বাসস্ট্যান্ডে এসে শুনলাম একঘন্টা পর বাস। অগত্যা বসে রইলাম।

হঠাৎ বাবার মানি ব্যাগটার কথা মনে পড়ল, যেটা বেরোবার সময় সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। বাবা এটায় কাউকে হাত দিতে দেয় না।
মাকেও না। এখন দেখি কত সাইড করেছে। খুলতেই তিনটে কাগজের টুকরো বেরল। প্রথমটায় লেখা "ল্যাপটপের জন্য চল্লিশ হাজার লোন"। কিন্তু আমার তো ল্যাপটপ আছে, পুরনো বটে। দ্বিতীয়টা একটা ডা: প্রেসক্রিপশন। লেখা "নতুন জুতো ব্যাবহার করবেন"। নতুন জুতো। মা যখনই বাবাকে জুতো কেনার কথা বলত বাবার উত্তর ছিল "আরে এটা এখনও ছ'মাস চলবে"। তাড়াতাড়ি শেষ কাগজটা খুললাম। "পুরানো স্কুটার বদলে নতুন বাইক নিন" লেখা শোরুমের কাগজ। বাবার স্কুটার!!
বুঝতে পেরেই বাড়ির দিকে এক দৌড় লাগালাম। এখন আর জুতোটা পায়ে লাগছে না। বাড়ি গিয়ে দেখলাম বাবা নেই। জানি কোথায়। একদৌড়ে সেই শোরুমটায়। দেখলাম স্কুটার নিয়ে বাবা দাঁড়িয়ে। আমি ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। কাঁদতে কাঁদতে বাবার কাঁধটা ভিজিয়ে ফেললাম। বললাম "বাবা আমার বাইক চাইনা। তুমি তোমার নতুন জুতো আগে কেন বাবা। আমি ইঞ্জিনিয়ার হব, তবে তোমার মতো করে।" "মা" হল এমন একটা ব্যাঙ্ক, যেখানে আমরা আমাদের সব রাগ, অভিমান, কষ্ট জমা রাখতে পারি। আর "বাবা" হল এমন একটা ক্রেডিট কার্ড, যেটা দিয়ে আমরা পৃথিবীর সমস্ত সুখ কিনতে পারি।

সংগৃহীত পোস্ট

উপহার

 - আজকে একটু বেশি সময় থাকলে তোমার সমস্যা হবে?

- কেন ম্যাডাম? কোন কাম আছে?
- হ্যাঁ! তোমার স্যার কিছু মাছ পাঠাবে। ও একটা কাজে আটকে গেছে। তাই দেরি হচ্ছে।
- ফুলির আব্বারে আগে জিগাই লই ম্যাডাম। হেই অনুমতি দিলে তারপর থাকুম।
নিশা অবাক হয়ে সালমার দিকে তাকালো। সালমা ওর বাসায় কাজ করে ছয় মাস ধরে। মেয়েটা খুব ভালো আর কাজ করে খুব গুছিয়ে। সাধারণত ছুটা বুয়াদের কাজ এতো গুছানো হয় না।
সালমা কাজ করেও পরিষ্কার পরিছন্নভাবে। আগে যতজন ছুটা বুয়া ছিলো কেউ চুরি করতো, কেউ অপরিষ্কার, কেউ সময়মতো আসতো না ইত্যাদি।
সালমার এমন কোন সমস্যা নেই।
সময়মত আসে, ঠিকঠাক কাজ করে চলে যায়। কথা বলে খুব কম। প্রয়োজন ছাড়া কোন কথা বলে না।
সালমার আগে যে কাজে ছিলো ওই ছুটা বুয়া খুব নোংরা ছিলো। ওকে দিয়ে দুইদিন কাজ করিয়ে নিশা পুরো মাসের বেতন দিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। তারপর নিজেই কয়েকদিন ঘরের কাজ করেছে।
অনভ্যস্ত হাতে নিশা খুব একটা গুছিয়ে উঠতে পারেনি। সাথে ৩বছরের একমাত্র মেয়ে খুব বিরক্ত করে।
তাছাড়া নিশা অসুস্থ থাকে একটু বেশিই। দারোয়ানকে বলে রেখেছিলো যেভাবেই হোক দ্রুত একজন ছুটা বুয়া জোগাড় করে দিতে।
দারোয়ান তার এক বোনের মাধ্যমে সালমার খোঁজ পায়। তারপর সরাসরি সালমার সাথে নিশার পরিচয় করিয়ে দেয়। পরদিন থেকেই সালমা নিশার বাসায় কাজ করে। নিশা সালমার কাজে, ব্যবহারে খুব খুশী।
- তোমার ফুলির আব্বা অনুমতি দিলো ?
- জি ম্যাডাম!
- সবকিছুতে ফুলির আব্বার অনুমতি নেওয়া লাগে ?
- ফুলির আব্বাও তার হগল কামে আমার অনুমতি নেয়। আমিও আমার কামে হের অনুমতি নেই।
- তোমাদের বিয়ে হয়েছে কতবছর ?
- পাঁচ বছর ম্যাডাম।
- ফুলির বয়স কত ?
- দুই বছর
- ফুলি কার কাছে থাকে?
- ফুলি তার আব্বার কাছে থাকে।
- ফুলির আব্বা কোন কাজ করে না ?
- ফুলির আব্বা অসুস্থ ম্যাডাম।
নিশার খুব ইচ্ছে হলো সালমার জীবনের গল্প শোনার। কিন্তু হুট করে জিজ্ঞেস করতে কেমন বিব্রত লাগছে তার। আর সালমাও এতো অল্প কথায় উত্তর দেয় নিশার মনে হয় সালমা খুব বেশি কথা বলতে পছন্দ করে না।
অথবা সে তার জীবনের গল্প হয়তো বাহিরে কাউকে বলতে চায় না। এমন সময় ড্রাইভার মাছ নিয়ে হাজির হলো।
অনেক গুলো ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছে ড্রাইভার।
সালমা মাছ কাটতে বসলো। নিশার মনে হতে লাগলো এমনিতে আজকে সালমাকে আটকে রেখেছে, আবার এতগুলো মাছ কাটতে ওর আরো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
তাই সে নিজ থেকে এগিয়ে গিয়ে বললো কিছু মাছ আস্ত ড্রিপ ফ্রিজে রেখে দিতে। পরদিন এসে কাটতে। সালমা বললো তার সমস্যা হবে না। সে আজকেই কেটে যাবে।
নিশা একটা চেয়ার টেনে সালমার সামনে বসলো। নিজ থেকেই বললো সামনের সাপ্তাহে তার একমাত্র মেয়ে তানিয়ার জন্মদিন। তানিয়ার বাবার অফিসে কিছু বিদেশী কলিগ আছে।
তাদের জন্য দেশি খাবারের বিশাল আয়োজন করা হবে। আজকের ইলিশ মাছগুলো সেই প্রোগামের জন্যই নিয়ে আসা। সালমা নিশার কথা শুনছে আর মাছ কাটছে। মাঝে মাঝে নিশার কথার সাথে হ্যাঁ, হুম করছে।
- ফুলির বাবা কবে থেকে অসুস্থ ?
- দেড় বছর হইয়া গেলো।
- কী হয়েছে ফুলির বাবার?
- রিক্সা চালাইতো। একসিডেন্ট করছিলো। প্রাইভেট কার ডাইন পায়ের উপর দিয়া গেছে গা। ডাইন পায়ের অর্ধেক এখন নাই হের।
- কী বলো! তোমার তো অনেক কষ্ট হয় এখন। সব সামাল দাও কিভাবে ?
- ঘরের রান্নাবান্না ফুলির আব্বা কইরা রাখে। ফুলিরে রাখে। আমি আফনার বাসা লইয়া ৪বাসায় কাম করি। বাসায় গিয়া কিছুক্ষন ঘুমাই। তারফর কোন কাম থাকলে করি। তয় ঘরের কাম আমার করণ লাগে না। সব ফুলির আব্বা করে। ফুলিরেও রাখে।
- বাহ্! ফুলির বাবা তো তোমাকে খুব যত্নে রাখে।
- জি ম্যাডাম!
নিশা হুট করে উঠে নিজের রুমে চলে গেলো। তানিয়া পেটে থাকতে একদিন রাতে তার ঘুম আসছিলো না। খুব অশান্তি লাগছিলো।
বিছানা থেকে উঠে সে কতক্ষন রুমে পায়চারি করে। কিন্তু অশান্তি দূর হচ্ছিলো না। তখন সে আসাদকে আলতো করে ডাকে।
আসাদ চোখ খুলে খুব জোরে নিশাকে ধমক দিয়েছিলো আর বলেছিলো সারাদিন পরিশ্রম করার পর এতরাতে নাটক দেখার সময় তার নেই।
আসাদ বরাবরই একটু কেমন জানি! টাকা ইনকাম করাই তার একমাত্র নেশা। পরিবারে আলাদা করে সময় দেওয়া, বৌ মেয়ের আলাদা যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে বরাবরই তার অনীহা।
এই যে তানিয়ার জন্মদিন পালন করবে এটা তানিয়াকে ভালোবেসে না বা তানিয়া তার একমাত্র মেয়ে এইজন্য নয়। অফিসে নিজের স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য নিজের মেয়ের জন্মদিন বড় করে পালন করছে।
অফিসের কলিগদের জন্য সব আলাদা ব্যবস্থা করেছে। বিয়ে করেছে, বাচ্চা নিতে হবে তাই আসাদ বাচ্চা নিয়েছে।
বাচ্চাকে আলাদা সময় দিতে হবে, বাচ্চার টানে ঘরে আসবে বা দিনে বাচ্চার খোঁজ খবর নিবে এসব ব্যাপার আসাদের মধ্যে নেই।
আসাদের মাথায় সারাক্ষণ ঘুরে টাকা আর সমাজে, সংসারে, অফিসে তার স্ট্যাটাস কতটুকু বাড়লো বা বাড়ানো গেলো।
আসাদের এমন চিন্তা ভাবনা আর ব্যবহারে নিশার মনে অভিমান জমতে জমতে পাহাড় হয়ে গিয়েছে। কিন্তু নিশা কখনো মুখ ফুটে এসব কথা বলে না।
বিয়ের প্রথম প্রথম বলতো কিন্তু যখন দেখলো আসাদের মধ্যে নিজেকে পরিবর্তন করার কোন লক্ষণ নেই তখন চুপ হয়ে গেলো।
উল্টা আসাদ নিজের খামখেয়ালিপনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এইদিকে নিশা নিজের আলাদা জগৎ বানিয়ে নিয়েছে।
কাউকে নিজের কথা বলে না। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু -বান্ধব সবাইকে এড়িয়ে চলে। বাহিরে প্রয়োজন ছাড়া তেমন বের হয় না।
আজকে সালমার কথা শুনে বহুদিনের জমানো অভিমান কেমন উথলে উঠলো। হুট করে নিশার খুব কান্না পেলো।
ওর বিশাল বাসা টাকা পয়সা, ব্যাংক ব্যালান্স সব আছে কিন্তু পাশে বসে কাঁধে হাত রাখার মানুষ নেই। অথচ সালমার এমন কিছুই নেই কিন্তু ভালোবাসার মানুষ আছে।
ঘরে কেউ একজন সালমার জন্য অপেক্ষা করে, সালমার কেয়ার করে, সালমার ভালো মন্দের খেয়াল রাখে। এইদিক থেকে সালমা অনেক ধনী আর সে খুব গরীব।
নিশা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হুট করে কেঁদে উঠলো। অনেক দিনের জমানো কান্না একসাথে বের হয়ে আসলো। নিশা সমানে কেঁদে যাচ্ছে।
- ম্যাডাম! মাছের কাম শেষ। আমি এহন বাড়ি যামু।
নিশা তাড়াহুড়া করে দুইহাত দিয়ে চোখ মুছে মুখ না ফিরিয়ে সালমাকে যেতে বললো। সালমাও চলে গেলো। নিশা ধীরে সুস্থে উঠে দরজা লক করলো।
তারপর ভাবলো বিয়ের আগে আসাদ কেমন ছিলো আর বিয়ের পর কিভাবে এবং কতটা বদলে গেলো। কেউ অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য লড়াই করে, আর কেউ একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য লড়াই করে।
- তোমারে এক ম্যাডামের কতা কইছিলাম না? আমার খুব পছন্দের ম্যাডাম। ওর একটা মাইয়াও আছে আমাগো ফুলির মতো। তার জন্মদিন সামনের সাপ্তাহে। বিশাল আয়োজন করতাছে তারা।
- তাইলে তোমারও কাম বাড়লো।
- হ! তাতো বারবোই। বিদেশী মেহমানও নাকি আইবো। তাগো লাইগ্যা দেশী খাবারের আয়োজন করবো।
আজকে মেলাডি ইলিশ মাছ আনছে। সব কাইটা দিয়া আইলাম।
- আমি সুস্থ থাকলে আমাগো ফুলির জন্মদিনও বড় কইরা করতাম। তই আমরা দেশী না, বিদেশী খাবারের আয়োজন করতাম।
এই কথা শেষ করে জব্বার আর সালমা দুইজনই হেসে দিলো। জব্বার মন থেকে কথাটা বললেও একটু মজার ছলে বলেছে।
সালমা মজা ভেবেই হেসে দিয়েছে। সালমার হাসি দেখে জব্বারও হেসে দিয়েছে। দুইজন আরো কিছুক্ষন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শেষ করে ঘুমাতে গেলো।
- দেখো তো সালমা এই কালারটা কেমন লাগে?
- রংটা সুন্দর। আফনারে মানাইছে।
- ঠিক বলছো ?
- জি ম্যাডাম! খুব সুন্দর লাগছে আফনারে।
- তাহলে এই কালারটা ফাইনাল। তানিয়া আর ওর বাবার জন্যও একই কালারের আর ডিজাইনের ড্রেস নিবো।
- সবাই এক রংয়ের পোশাক পরবেন?
- হ্যাঁ! ভালো হবে না বলো ?
- জি ম্যাডাম!
- আচ্ছা সালমা শোন! তোমাকে এই কয়দিন একটু বেশি সময় দিতে হবে। আরেকটা কথা প্রোগ্রামের দিন ফুলি এবং ফুলির বাবাকে অবশ্যই নিয়ে আসবা। সপরিবারে তোমাদের নিমন্ত্রণ।
- ম্যাডাম! আফনে আমাকে দাওয়াত দিলেন ?
- হ্যাঁ! কেন ?
- কত বাসায় কাম করি। কোনোদিনও কেউ এমন কইরা দাওয়াত দেয় নাই।
- এসব কথা বাদ দাও। আনন্দের সময় আনন্দের কথা বলতে হয়। মন খারাপের কথা বাদ দাও।
সালমা চোখ মুছে হাসলো। তানিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করলো। সেদিনের মতো কাজ শেষ করে বিদায় নিলো।
- যে ম্যাডামের মাইয়ার জন্মদিন ওই ম্যাডামে তোমারে আর আমাগো ফুলিরেও দাওয়াত করছে।
- সত্যি কইতাছো ? তোমার ম্যাডামের মন অনেক বড় মনে অইতাছে।
- ম্যাডাম অনেক ভালা মনের মানুষ। হেই লাইগ্গা তো হেরে আমি অনেক পছন্দ করি। আমার লগে কত সুন্দর কইরা কতা কয়।
- তোমার ম্যাডামের মাইয়ার লাইগ্গা একটা সুন্দর উপহার কিনতে হইবো।
- কী দেওন যায় কওতো!
- মাইয়ার কী পছন্দ হেইডা তো তুমি জানবা ভালো। তুমি কাইল জাইনা আইয়ো।
- আইচ্ছা!
অনেকদিন জব্বার বাহিরে যায় না। তাই জব্বারের তেমন কোন নতুন ড্রেস নেই। সালমা ভাবছে জব্বারের জন্য নতুন শার্ট, প্যান্ট কিনতে হবে। ফুলির জন্যও নতুন একটা ফ্রক কিনবে। তার নিজেরও তো তেমন নতুন কিছু নেই।
গ্রাম থেকে আসার পর এই প্রথম তারা কোন দাওয়াতে যাবে । তাও এতো বড়লোকের বাড়ির অনুষ্ঠানে। এইদিকে জব্বারও ভাবছে সালমার নতুন কোন পোশাক নেই।
ওর জন্য নতুন পোশাক কিনতে হবে। দুইজনেই দুইজনের জন্য ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলো।
পরেরদিন সালমা কাজ শেষ করে নিশার সামনে কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। সালমার দাঁড়ানো দেখে নিশা জানতে চাইলো সালমা কিছু বলবে কিনা।
- ম্যাডাম! আমার একটা কাম কইরা দিবেন ?
- কী কাজ?
- কইতে ডর লাগতাছে। আফনে অন্য কিছু মনে করবেন নাতো ?
- না না! তুমি বলো। কোন সমস্যা নেই।
- আপনি নিজের জন্য, স্যারের জন্য আর মামনির জন্য এক রংয়ের পোশাক নিবেন না ? তেমনি এক রংয়ের পোশাক আমার জন্য, ফুলির বাপের জন্য আর ফুলির জন্য কিন্না দিতে পারবেন ?
নিশা অবাক হয়ে সালমার দিকে তাকিয়ে আছে। নিশা পোশাকের দামের ব্যাপারে ভাবছে না। ভাবছে সালমার শখের ব্যাপারে, সাধের ব্যাপারে।
- পারবো না কেন? অবশ্যই পারবো। তুমি ফুলি আর ফুলির বাবার মাপ জানো ?
- কাল জাইন্না আমু। ম্যাডাম টাহা কত লাগবো?
- টাকা নিয়ে তোমাকে এখন ভাবতে হবে না। পরে দিও।
- যহন ফুলির বাপে কামাই করতো তখন হেই প্রতিদিন কামে যাওয়ার আগে আমার হাতে কিছু কিছু টাহা দিয়া যাইতো। আমি হেই টাহা সব জমাই রাখছি।
এহন প্রতি মাসেও কিছু টাহা আলাদা করে রাহি। এই টাহা জমাইতেছিলাম ফুলির কানের সোনার জিনিসের লাইগ্গা। ফুলি জন্ম নেওয়ার কয়েকমাস পরেই ফুলির বাপের দুর্ঘটনা ঘটে।
এরপর আমাদের হগল আনন্দ মাটি হইয়া গেছে। আপনি দাওয়াত দিলেন ফুলির আব্বায় খুব খুশি হইছে। আপনি কাল কইলেন আপনি, স্যার আর মামনি একরহম পোশাক পরবেন। কাল রাতে আমিও ভাবলাম আমি, ফুলির আব্বা আর ফুলি একরহম পোশাক পড়ুম।
- তোমার মন খুব সুন্দর সালমা। তোমাকে এই জন্য আমার খুব ভালো লাগে। তুমি কাল মাপ জানাও। টাকা পরে নিবো।
বাকি তিন বাসায় কাজ করে সালমা কত পায় নিশা জানে না। তবে নিশার বাসা থেকে মাস শেষে যতটুকু টাকা সালমা পায় তার কয়েকগুন বেশি টাকা খরচ হবে এই তিনজনের সেইম কালার আর ডিজানের পোশাকে।
এই কথাটা নিশার বলতে খারাপ লাগছিলো।
দামের কথা শুনে সালমা হয়তো পিছিয়ে যাবে। মনে মনে একই রঙের এবং ডিজাইনের পোশাক পরার যে স্বপ্ন সালমা দেখেছে সেটা হয়তো ভেঙে যাবে।
খুশী খুশী মনে সালমা সেদিন কাজ শেষ করে মার্কেটে গেলো। তানিয়ার জন্য জন্মদিনের উপহার কিনতে হবে। সালমা অনেক ঘুরেও তানিয়ার জন্য উপযুক্ত উপহার খুঁজে পেলো না।
যা দেখে তা পছন্দ হয় না, যেগুলো পছন্দ হয় সেগুলো টাকাতে কুলায় না। অনেক ঘুরেফিরে খালি হাতে বাসায় ফিরে আসলো সালমা।
- তোমার ম্যাডামের মেয়ের জন্য কী কিনবা কিছু ভাবলা ?
- আজকে কাম শেষ করে একটু মার্কেটে গেছিলাম। যা পছন্দ হয় সেগুলো সাধ্যে কুলায় না। চাইলেই তো সবকিছু তানিয়া মামণিকে দেওন যাইবো না।
- আমাগো মাটির ব্যাংকটা ভাইঙ্গা দেহো কত টাহা জমছে। সেই টাহার লগে আরো কিছু টাহা মিলাইয়া সোনার কিছু দেওন যায় কিনা দেহো।
- আইচ্ছা! দেখতাছি।
মাটির ব্যাংক ভেঙে সালমা দেখলো খুবই সামান্য কিছু টাকা জমেছে। অনেক ভাবনা চিন্তা করে সালমা ঠিক করলো তার ম্যাডামকে পোশাকের টাকা পরের মাসে দিবে।
পোশাকের জন্য যে টাকাটা খরচ করবে বলে ঠিক করেছে সেটা দিয়ে তানিয়ার জন্য উপহার কিনবে।
এইদিকে নিশা নিজেদের জন্য সে কালার আর ডিজাইন অর্ডার দিয়েছে, সেইম কালার এবং ডিজাইন সালমা, তার স্বামী এবং মেয়ের জন্য অর্ডার দিলো।
জীবনে কে কবে দেখেছে নিজের মেয়ের জন্মদিনে নিজেরা যেমন ড্রেস পরবে , সেইম একই ড্রেসের অর্ডার কেউ তার হেল্পিং হ্যান্ড এবং তার পরিবারের জন্য করে।
জীবনে কে কবে দেখেছে নিজের মেয়ের কানের দুলের জন্য জমানো টাকা দিয়ে যার বাসায় কাজ করে তার মেয়ের জন্মদিনের উপহার হিসেবে সেই মেয়ের জন্য কানের দুল কিনতে।
ভালোবাসা ফিরে আসে। অন্যের জন্য ভালো কিছু করলে নিজের সাথেও ভালো কিছু ঘটে।

ফারজানা আক্তার

source: https://www.facebook.com/groups/1232033027465545/permalink/1410322562969923/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

সবাই উপকার মনে রাখে না

ফিলিস্তিনি বালক আব্দুল আলী নামে প্রচারিত ছবি ও গল্পটি বিভ্রান্তিকর


সবাই উপকার মনে রাখে না, ফিলিস্তিনের সেই ছেলেটি মনে রেখেছিলঃ

ড. মুহাম্মদ খানী বলেন, একদা আমি আমার গাড়িতে বসা ছিলাম হঠাৎ ষোল বছর বয়সী এক বালক এসে আমাকে বলল, স্যার আমি কি আপনার গাড়ির সামনের গ্লাসগুলো পরিস্কার করে দিতে পারি?
আমি বললাম হ্যা।
সে অত্যন্ত সুন্দর করে গ্লাস পরিস্কার করে দিলে আমি তার হাতে ২০ডলার গুজে দিলাম।
ছেলেটি কিছুটা অবাক হয়ে বলল, আপনি কি আমেরিকায় থাকেন?
আমি বললাম হ্যা। কেন?
সে বলল, আমি কি এই ২০ ডলারের পরিবর্তে সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে কিছু কথা জানতে পারি?
আমি তার বিনয় ও লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে তাকে কাছে ডেকে নিয়ে আলাপ শুরু করে দিলাম।
আলাপের শেষ দিকে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি এভাবে রাস্তায় গাড়ি পরিস্কারের কাজ করে বেড়াচ্ছ কেন তুমি তো একজন মেধাবী ছাত্র?
উত্তরে সে বলল, আমার দু বছর বয়সেই আমার আব্বু মারা যান। আমার মা মানুষের বাড়িতে বুয়ার কাজ করে। আমি এবং আমার ছোট বোন বাইরে টুকটাক কাজ করে বেড়াই বাড়তি কিছু রোজগারের আশায় যা দিয়ে আমাদের লেখাপড়ার খরচ চলে। আমি শুনেছি আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নাকি মেধাবী ছাত্রদের উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য স্কলারশিপ দেয়। আমার খুব ইচ্ছা সেখানে পড়ার। কিন্তু সেখানে আমাকে সাহায্য করার মত তো কেউ নেই।
আমি বললাম চল আগে আমরা একসাথে ডিনার করি।
সে বলল একটি শর্তে কবুল করতে পারি। আর তা হল বিনিময়ে আমি আপনার গাড়ির পেছনের গ্লাসগুলোও পরিস্কার করে দেব।
আমি কথা না বাড়িয়ে তা মেনে নিয়ে হোটেলে ঢুকলাম।খাবার অর্ডার করলে সে ওয়েটারকে বলল তারগুলো পার্সেল করে দিতে। সে বাসায় গিয়ে তার মা আর বোনকে নিয়ে খাবে। খেয়াল করলাম তার ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অসামান্য।
বিদায় বেলায় সিদ্ধান্ত হল সে তার কাগজপত্রগুলো আমাকে দিবে, আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করব।
এভাবে দীর্ঘ ছয়মাস পর আমি তাকে আমেরিকা এনে ভালো একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে সক্ষম হলাম।
সে তার তার মেধা ও অধ্যাবসায়ের জোরে কয়েক বছরের মধ্যেই আধুনিক টেকনোলজির কনিষ্ঠ টেক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নিউইয়র্ক টাইমসের পাতায় তাকে নিয়ে লিড নিউজ হলে সারা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়।
তার ঈর্ষনীয় সফলতায় আমি ও আমার পরিবার যারপরনাই আনন্দিত হই। এদিকে তাকে না জানিয়ে তার মা ও বোনের ভিসা ব্যবস্থা করে আচমকা তার সামনে আমেরিকায় নিয়ে এসে তাকে বড়সড় সারপ্রাইজ দিয়ে চমকে দেই। তাদের দেখে সে বোবা বনে যায়। এমনকি কাঁদতে পর্যন্ত ভুলে যায়। এখন সে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা প্রফেসর।
তারও কিছুদিন পর আমি একদিন বাসা থেকে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। দেখি সে বাইরে দাঁড়িয়ে আমার গাড়ির গ্লাসগুলো পরিস্কার করছে!
চটজলদি দৌড় গিয়ে তাকে বাধা দিয়ে বলি এগুলো কি করছো?
সে অশ্রুসজল চোখে বলল, ছাড়ুন স্যার! আমাকে আমার কাজ করতে দিন। যেন আমি আমার পরিচয় ভুলে না যাই। আমি মনে রাখতে চাই আমি কি ছিলাম আর আজ কি হলাম। এবং আপনি আমার জন্য কী করেছেন।
এই সেই ফিলিস্তিনি যুবক ফরিদ আব্দুল আলী। যিনি বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসিদ্ধ লেকচারার।

অনুপ্রেরণা

 বিয়ের পরেরদিন আমার স্ত্রী "বেলা" পরিবারের সবার জন্য দুপুরে নিজ হাতে রান্না করেছে। সবাইকে খাবার পরিবেশন করে উচ্ছাসিত কণ্ঠে জানতে চাইলো, "মুরগীর মাংসটা কেমন হয়েছে?"

আমি সবেমাত্র এক লোকমা ভাত মুখে তুলে ছিলাম, এখন গলা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অতিরিক্ত লবন, মরিচের ফলে মাংসের স্বাদ নষ্ট হয়ে অ'খা'দ্য হয়েছে। আমি কিছু বলার আগেই আমার আম্মা আমায় ইশারায় চুপ থাকতে বললো। এরমধ্যে পাশ থেকে বাবা মাংস চিবাতে চিবাতে বললো, "বউমা রান্নাতো দারুণ হয়েছে! আজকে মনে হচ্ছে আমার মায়ের হাতের সেই সুস্বাদু খাবার খাচ্ছি।"
বেলা খুশিতে গদগদ করে বললো,
"বাবা আপনাকে আরেকটু মাংস দেই?"
"দেও বউমা। আজকে ডালটাও খুব মজা হয়েছে।"
বেলা হাসি হাসি মুখে বাবা'কে তুলে এটা সেটা দিচ্ছে, বাবা প্রশংসা করছে। আমি হঠাৎ খেয়াল করলাম রান্না করতে গিয়ে ওর ডান-হাতটা পু'ড়ে গিয়েছে। বাবা'র ঘরে খুব আহ্লাদী মেয়ে বেলা, রান্না ঘরের ধারে-কাছেও যায়নি কখনো। আজ ওর পো'ড়া হাতের দিকে তাকিয়ে সবাই চুপচাপ এই অখাদ্যই অমৃত মনে করে গিলে নিলাম। সব শেষ করে বেলা যখন খেতে বসলো। খাবার মুখে নিয়েই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। পরমুহূর্তে অপরাধীর ন্যায় মুখ কালো করে বললো,
"এতো জঘন্য খাবার তোমরা কি করে খেলে? আমি সব খাবার গুলোই নষ্ট করে ফেললাম।"
মা ওর মুখে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বললো, "রান্না করতে করতে একদিন সব শিখে যাবে মা। মন খারাপ করো না! আমরা কিচ্ছুটি মনে করিনি।"
আমাদের উৎসাহ আর সবার থেকে সাপোর্ট পেয়ে বেলা হতাশ না হয়ে মায়ের কাছ থেকে বিভিন্ন রান্না আগ্রহ নিয়ে শিখছে। ইউটিউব দেখে নিত্য নতুন রেসিপির ট্রাই করছে। যদিও খুব একটা ভালো হতো না সেসব, হয়তো লবনে বেশি বা কম হতো নয়তো ঝাল হতো, পুড়ে যেতো। তবুও আমার মা-বাবা বলতো খুব ভালো হয়েছে খাবার। মাঝে-মধ্যে আমি খুঁত ধরলে আম্মা রেগে গিয়ে বউয়ের সাপোর্ট করতেন। এতে বেলা আনন্দে পায়। আমি বললেও সেসব মন থেকে বলতাম না। আসলে যাতে আমার বউকে মা-বাবা কথা শুনানোর সুযোগ না পায়, সেজন্য তাদের কথা গুলো আমি বলে দিতাম। আবার সবার আড়ালে সরি ও বলতাম বেলা'কে।
বিয়ের পনেরো দিন পর আজ অফিসে আসছি। সকালে আমার বউ যত্ন করে দুপুরের খাবারের টিফিন রেডি করে তুলে দিলো আমার হাতে।আবার লাঞ্চ টাইমে কল দিয়ে বললো, "খেয়েছো মাহমুদ?"
"না। মাএ কাজ শেষ হলো। এইতো এখন খাবো। তুমি খেয়েছো?"
"উঁহু। তুমি খেয়ে নেও, আমিও এখন খাবো।"
"আচ্ছা রাখছি। টেক কেয়ার।"
হাসি মুখে বউয়ের কল কেটে খেতে বসলাম। বক্স খুলে দেখি ভাত, আধপোড়া শাক ভাজি, আর মাছ দিয়েছে বউ। আমি বউয়ের হাতের এই পোড়া তিতকুটে স্বাদের খাবার খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছি। এই খাবারে যতটুকু ভালোবাসা মিশানো আছে, তা ওই বড়সড় রেস্টুরেন্টের খাবারেও কখনো পাইনি। এরিমধ্যে আমার কলিগ শাহাদাত এসে বললো, "এতো মজা করে, কি খাচ্ছেন ভাই?"
"এইতো ভাই শাক আর মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছি।"
"নতুন ভাবি রান্না করেছে নাকি?"
"জি, আপনার ভাবিই রান্না করেছে।"
"নতুন ভাবির হাতের রান্না নিশ্চয়ই লোভনীয়!"
"তা বটে!"
"আপনার কপাল ভাই! দুইবছর হলো বিয়ে করছি তাও আপনার ভাবির হাতের রান্নায় কোনো স্বাদ পাই না। কি যে রাঁধে!"
হতাশ হয়ে আমার পাশের চেয়ারটায় বসে খাবার বের করলো শাহাদাত ভাই। উনার মুরগির মাংসের ঘ্রান ছড়িয়ে গিয়েছে, কালার টাও সুন্দর। দেখেই মনে হচ্ছে, রান্না মজা হয়েছে। তবুও কিছু পুরুষ আছে নিজের স্ত্রী যত ভালোই রাঁধুক পেটপুরে খেয়েও বলবে, ভালো হয়নি। এরা কখনো তো প্রশংসা করেই না উল্টো খুঁত ধরে। এদের কাছে পরের হাতের বিশ্রী স্বাদের খাবারও মজার হয়। আমি আর কিছু না বলে চুপচাপ খাচ্ছি। তা দেখে উনি আবারও বললেন, "নতুন বউয়ের হাতের খাবার একা একা খান কেন মিয়া! আমাদেরও একটু শেয়ার করেন।"
আমি বাধ্য হয়ে এক-টুকরা মাছ তুলে দিলাম উনার পাতে। আমার বউয়ের হাতের লবনাক্ত মাছ উনি একটুখানি মুখে দিয়েই মুখ কুঁচকে ঠাট্টা করে বললেন,"আপনার খাওয়া দেখে ভাবলাম ভাবির হাতের রান্না না জানি কত মজা! এটা মাছ ভাজি নাকি তেঁতো করলা? এসব বিশ্রী খাবার আপনি কেমনে গিলেন ভাই? হুদাই খাবার নষ্ট করা!"
আমি মুচকি হেসে বললাম, "আপনি খাবারের স্বাদ খুঁজলেও আমি এতে খুঁজে পেয়েছি ভালোবাসা ভাই। আমার স্ত্রী ভোর পাঁচটায় উঠে একা একা সব গুছিয়ে আমাকে গরম গরম রান্না করে সকালে খাইয়ে দেয়। আসার সময় মনে করে দুপুরের খাবারের বক্স হাতে তুলে দেয়। যে মানুষটা আমার জন্য এতকিছু করে, তার খাবার কি করে খারাপ হয় বলুন তো? আজ রান্না খারাপ হয়েছে তো কি হয়েছে? একদিন ঠিক ই ভালো হবে।"
এরমধ্যে আমার খাওয়াও শেষ। আমি আর কিছু উনাকে না বলতে দিয়ে চুপচাপ উঠে দাঁড়ালাম। বউকে কল দিয়ে বললাম, "আজকের রান্নাটা অনেক মজা হয়েছে বেলা।"
বউ খুশী হলো। উৎসাহিত কণ্ঠে জানালো, "আজকে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমি তোমার পছন্দের পায়েস বানাচ্ছি।"
আমি হেসে সম্মতি জানালাম। ফোন কেটে নিজের কাজে গেলাম।
_________
পাগলীটার সাথে দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেলো। আজ আমাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। সেই উপলক্ষে নিকটতম আত্মীয় স্বজন ও শাহাদাত ভাইকে দাওয়াত দিয়ে, ঘরোয়া আয়োজন করেছি। কেক কাটার পর্ব শেষ করে সবাইকে খাবার দিয়েছি। সবাই খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছে। এরমধ্যে শাহাদাত ভাই খাবার মুখে দিতে দিতে বললেন, "কাচ্চিটা যা হয়েছে না ভাই! কোন রেস্টুরেন্টে থেকে অর্ডার করছেন?"
আমি কিঞ্চিৎ হেসে বললাম, "এগুলো সব আপনার ভাবিই রান্না করেছে ভাই। বলছিলাম না একদিন ঠিকই রান্না শিখে যাবে। বুঝলেন ভাই, ঘরের বউকে ভালোবাসতে হয়। তাদের খারাপ কাজেও গাল-মন্দ না দিয়ে উৎসাহ দিতে হয়। এতে তারা হতাশাগ্রস্ত না হয়ে মনোবল পায়, কাজের প্রতি মনোযোগী হয়। বাবার ঘরের অকর্মা মেয়েটাও আজ কাজ না পারলে, কাল ঠিকই শিখে যায়। শুধু এই সময়ের আপনার/আমার করা ব্যবহারটা তার মনের মাঝে রয়ে যায়। বুঝলেন ভাই?"
(সমাপ্ত)
লেখনীতেঃ #সুমাইয়া_আফরিন_ঐশী

source: https://www.facebook.com/100014866035700/posts/1980995059072676/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v


বই বিজনেস

 আমার বান্ধবী নুসরাতের ঠিকানায় কেউ একজন দশটা বই পাঠিয়েছে। চিরকুটে লেখা, ‘বইমেলা থেকে তোমার প্রিয় কিছু বই পাঠালাম।’

নুসরাত সেই বই নিয়ে ঝামেলায় পড়ছে। বাসায় নিলে সমস্যা। অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। বাধ্য হয়ে সে বইগুলো আমার কাছে রাখতে দিলো।
পরের দিন নুসরাত আবার আমাকে ডেকে নিয়ে বললো, ‘দোস্ত আজকেও কুরিয়ার অফিস থেকে কিছু বই আসবে। তুই প্লিজ রিসিভ করে তোর বাসায় নিয়ে নে।’
যথা সময়ে আমি রাস্তার মোড়ে গেলাম। দেখি কুরিয়ারের এক লোকের হাতে কাগজে মুড়ানো চারটা বইয়ের গাট্টি। কোরিয়ার লোক জাস্ট অবাক হয়ে বললো, ‘ভাই সাব, এই এক নুসরাতের ঠিকানায় ঢাকা,চট্টগ্রাম, খুলনা সব জায়গা থেকে বই আসে কেমনে? উনি কী বইয়ের ডিলার নাকি?’
আমি কিছু বললাম না। বাসায় এসে বইগুলো খুললাম। আজকে মোট ৪৫টা বই। সাথে কয়েকটা নীল খামের চিরকুটও। একটায় লেখা, ‘এই যে, বইপড়ুয়া মেয়ে, তোমার না অনেক বই পড়ার শখ, একটুখানি ভালোবাসা দিলাম। তোমার শখ পূরণ করাই আমার নেশা।’ আহ কী সুন্দর ভালোবাসা।
আজকে দেখি হঠাৎ আমার ফেসবুক পরিচিত এক বড় ভাই নক দিয়ে বললেন, ‘ ছোট ভাই, তোমার বাসা সুনামগঞ্জ না? তোমার ঠিকানায় কিছু বই যাবে। ঐ বইগুলো একজনকে দিও। মানুষটা তোমার জেলার। ওরে আমি সারপ্রাইজ দিতে চাই। প্লিজ এতটুকু কষ্ট করো। কোরিয়ারে দিলে মেয়েটা জেনে যাবে।’
তারপর সব তথ্য নিয়ে বুঝলাম, বইগুলো নুসরাতকে দিতে হবে। অথচ এই ভাইকে আমি চিনি। উনি তিন বছর আগে একবার বলছিলেন, আমাকে বই উপহার দিবেন। তারপর থেকে নাকি উনি আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছেন। উনার অর্থনীতির চাকা নাকি ধ্বসে গেছে। এখনো সেই ক্ষতি কাটায়ে ওঠতে পারেন নাই। এদিকে নুসরাতকে উনি সব মিলিয়ে ১৫টা বই উপহার দিছেন। কী অদ্ভুত এসব বড় ভাইয়েরা।
যাইহোক, এসব বড় ভাইদের কারণে নুসরাত আর আমার ‘আপনার বইঘর’ নামক একটা অনলাইন বুকশপ চালু হয়ে গেছে। আমাদের সংগ্রহে এখন ২০০+ বই আছে। ভালোই চলছে আমাদের বই ব্যবসা।
এই পুরো প্লানটা আমার। যখন দেখলাম ফেসবুকের বই পড়ুয়া ভাইয়েরা সুন্দ্রী মেয়ে দেখে বই উপহার দেন, তখন আমি নুসরাতের দ্বারস্থ হই। নুসরাত এসব কাজে অনেক পটু। এই চমৎকার বিজনেস আইডিয়া ওকে বুঝিয়ে বলি।
তারপর নুসরাত ফেসবুকে নতুন একটা আইডি খুলে বই পড়ুয়া মেয়ে সাজে। সে আইডির পাসওয়ার্ড আমার কাছেও আছে। যেহেতু নুসরাত জীবনেও বই পড়ে নাই, তাই আমি প্রতিদিন ঐ আইডির টাইমলাইনে বা বিভিন্ন গ্রুপে বই সম্পর্কে পোস্ট দিয়ে জানিয়ে দেই, নুসরাত কত বড় মাপের বইপড়ুয়া।
আরো কত আবেগপ্রবণ পোস্ট দেই, যেমন ‘মেয়ে হয়ে জন্ম নিছি। টাকা কামাতে পারি না তো কী! পিডিএফ পড়েও শত শত বই পড়া যায়। একদিন অনেক টাকা হবে আমার। অনেক বই কিনবো সেদিন।’ সেসব আবেগপ্লুত পোস্ট দেখে নুসরাতের ইনবক্সে মানবতার ঢুল বাজাতে বাজাতে এসে হাজির হোন, ফেসবুকের বই লাভার ওরফে মেয়ে পটানো সিম্প ভাইগুলো। তারা জানিয়ে দেন, বই পড়া এবং বই গিফট দেওয়া তাদের নেশা। এসব কথা বলার সময় আবেগে তাদের গলা বুঁজে আসে।
পরিশিষ্ট : এখন থেকে নুসরাতকে যারা বই গিফট দিতে চাচ্ছে, তাদেরকে নুসরাত বলছে, বই উপহার দিলে যাতে ‘আপনার বইঘর’ নামক বুকশপ থেকে দেয়। ওখানে কালেকশন ভালো। কুরিয়ারও কম রাখে ওরা।
আলহামদুলিল্লাহ অলরেডি দুই ভাই নুসরাতের নামে বই অর্ডার করেছেন। কোনো কুরিয়ার চার্জ না ধরায় উনারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করেছেন। মানে, আমাদের বুকশপ থেকে বই কিনে আমাদেরকেই গিফট করা হচ্ছে। এই বিজনেস লস খাবে কেমনে? আমাদের উন্নতি এখন চোখে পড়ার মতো। দোয়া করবেন সবাই।

হাসান মাহমুদ ইমন
source: https://www.facebook.com/61556672572653/posts/122169144434222419/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

পারস্পরিক শ্রদ্ধা

 বন্ধু প্রথম এলো আমাদের বাড়িতে। আমরা খাচ্ছিলাম আর গল্প করছিলাম। খাওয়া শেষে বন্ধুর কাছে সময় চাইলাম কয়েক মিনিট─ "একটু বোস্‌ রে, আমি প্লেটগুলো পরিষ্কার করে এখনই আসছি কিচেন থেকে।" বলে, প্লেটগুলো হাতে তুলে নিচ্ছিলাম। লক্ষ্য করলাম, বন্ধু বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে! আমার স্ত্রী ততোক্ষণে কিচেনে চলে গেছে।

আমাকে ভদ্রভাবেই জিজ্ঞেস করলো সে অতঃপর─ "স্ত্রীকে সাহায্য করছিস কাজে, দেখে আমার ভালোই লাগছে রে। আমার মূলত ওর কাজে হেল্প করা হয় না, আগ্রহটিই মরে গেছে। শুরুতে কয়দিন করেছিলাম ওর কাজে হেল্প, কিন্তু ধন্যবাদটুকুও দেয় না। শেষবার যখন পুরো মেঝেটা পরিষ্কার করেও কোনো ধন্যবাদ পেলাম না, ওর কাজে হেল্প করা ছেড়েই দিলাম একেবারে।"
বন্ধুটিকে আমি খুব পছন্দ করি। খুব ভালো ছেলে। আমি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না, তাকে এই 'হেল্প' বিষয়ে আমার ভাবনাটি বলা উচিৎ হবে কিনা। কেউ তো কারও চেয়ে কম বোঝে না এই সময়ে! তবু, মনে হলো, এই ভালো ছেলেটি ছোট্ট একটি ভুল ধারণা মস্তিষ্কে পুষে রেখে আসন্ন সুন্দর দাম্পত্য জীবনটিকে জটিল করে তুলছে খুব সম্ভবত। আমি তো বন্ধু ওর, আমার কি উচিৎ নয় তাকে এই ছোটখাটো ভুল ভাবনার বিশাল ও মারাত্মক প্রভাব বিষয়ে একটু সতর্ক করা? আমি দোদুল্যমানতা কাটাতে পারলাম অবশেষে।
প্লেটগুলো টেবিলের একপাশে সরিয়ে রেখে, মুখোমুখি বসলাম আবারও। আশ্বস্তের স্বরে বলতে আরম্ভ করলাম বন্ধুর চোখে চোখ রেখে─
"দোস্তো, আমি স্ত্রীকে 'হেল্প' করছি না। সত্যি বলতে কি─ এই হেল্প-এর তাঁর প্রয়োজনই নেই। তাঁর একজন পার্টনারের প্রয়োজন ছিল জীবনে, দাম্পত্যসাথীর প্রয়োজন ছিল; একারণেই তো আমরা একসাথে আছি। আমি ও সে মিলে, একটি টিম মূলত। আমরা পরস্পরের টিম-মেট। আমি ওর হোম-পার্টনারও, অতএব সংসারের সমস্ত কাজ ভাগাভাগিতে করি আমরা, পার্টনারশিপ-শেয়ারিং-এ। এই ভাগাভাগিকে আমি কিভাবে 'হেল্প' বলতে পারি? এ 'সাহায্য' নয় রে, একে আমরা বলতে পারি─ টিমকে সচল রাখতে টিমের প্রত্যেক সদস্যের একে-অপরকে 'সহযোগিতা' করা, দায়িত্বের ভাগাভাগিতে। 'সাহায্য' ও 'সহযোগিতা' আলাদাই রে, তাই না?
ঘর মোছায় আমি স্ত্রীকে 'সাহায্য' করি না; কারণ এই ঘরে আমিও থাকি, অতএব একে পরিষ্কার আমাকেও করতে হবে। 'সহযোগিতা'।
রান্নায় স্ত্রীকে 'সাহায্য' করি না আমি; কারণ আমিও খাই, আমাকেও রান্নার কাজে যতোটা পারি 'সহযোগিতা' করতে হবে।
খাওয়া শেষে প্লেট ধোওয়ায় ওকে 'হেল্প' করি না আমি; এই প্লেটে আমিও খাই, আমারও দায়িত্ব এই প্লেট পরিষ্কার করা, সহযোগিতা করা।
বাচ্চাদের যে-কোনো কাজে আমি স্ত্রীকে 'হেল্প' করি না; ওরা আমারও সন্তান, ওদের প্রতিটি প্রয়োজনে ভূমিকা রাখা আমার অংশীদারিত্বের মধ্যেও পড়ে। তাহলে?
আমাদের, বাচ্চাদের, জামাকাপড় ধোওয়া, বাজার করা, এই সব ক্ষেত্রেও আমি বলবো, আমরা পরস্পরকে 'সাহায্য' করি না; আমরা পারস্পরিক 'সহযোগিতা'য় সংসার-টিমটিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি।
আমি 'সাহায্যের হাত' বাড়িয়ে দেই না আমাদের সংসারের কোনো কাজে, আমি এই সংসারেরই একটি অংশ হিসেবে নিজের দায়িত্বটিই সম্পাদন করি।
বন্ধু, সংসারের বাইরেও আমরা উভয়ে যার-যার মতো এইযে কাজ করছি, উপার্জন করছি, এ তো এই সংসারের জন্যই। তো, আমাদের ওই কাজের পরে, এই সংসারের মধ্যেও তো আমাদের যার-যার কাজ রয়েছে দায়িত্বে! আমি এভাবেই ভাবি রে!"
আমার বন্ধুটি আহত হলো না এসব কথায়। সে মনোযোগ দিয়ে শুনলো সমস্তটা। তার আগ্রহ লক্ষ্য করে, এ পর্যায়ে আমি ভদ্রতার সাথেই জানতে চাইলাম─ "সর্বশেষ কবে তুই, স্ত্রীর ঘর মোছা, রান্না করে খাওয়ানো, বাজার করা, বাচ্চাদের পড়াশোনা করানো, কাপড় ধোওয়া, এমনকি বেডশিট পাল্টানোর জন্য, তাঁকে ধন্যবাদ দিয়েছিস?"
বন্ধু চুপ হয়েই রইলো।
─ "ধন্যবাদ আমরা দেই না স্ত্রীদেরকে, তো আমরা কিভাবে আশা করছি তাঁদের কাছ থেকে 'ধন্যবাদ'?
আমাদের পাঠ্যবই, আমাদের সমাজ, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের নিজেদের পেশিশক্তির গৌরব, এইসবই আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে এই বীভৎস ভ্রান্ত ধারণাটি ঢুকিয়ে দিয়েছে, যে─ ঘরোয়া কাজ মেয়েলি; এসব করবে মেয়েরাই। এসব করলে আমাদের জাত যাবে। আমরা সেরা প্রজাতি, ওরা তো দ্বিতীয়-লিঙ্গ মাত্র! এই ভাবনাই আমাদের সংসারে ফাটল ধরার, সংসারের মুখ থুবড়ে পড়ার, অন্যের সংসারের উন্নতি দেখে পরশ্রীকাতর হওয়ার, মূল কারণ দোস্তো। এই কুৎসিত ভাবনার সবচেয়ে বড়ো ক্ষতিটি হলো─ আমরা এই ভাবনাটি আমাদের সন্তানদের মাথায়ও ঢুকিয়ে দিচ্ছি প্রতিনিয়ত; ফলে আমাদের সন্তানরা হয়ে উঠছে সংসারবিমুখ, নারীর প্রতি মর্যাদাবোধহীন; এর প্রতিক্রিয়ায় নারীরাও হয়ে উঠছে এরকম ছেলেদের প্রতি বিরক্ত ও সম্মানবোধহীন, এমনকি আমাদের পুত্ররা এরকম অসভ্য ধারণার কারণেই মূলত হয়ে উঠছে নির্যাতনকারী, রেইপিস্ট। আয়, আমরা পরিবার থেকেই আরম্ভ করি; এভাবে আমাদের সন্তানেরা গড়ে উঠবে সুস্থ মানসিকতার মানুষ হয়ে একেকজন, ওরা গড়ে তুলবে সুস্থ সমাজ; এভাবেই তৈরি হোক একটি পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ অপরূপ মানবজাতি। পৃথিবীটা সুন্দর হোক।"
Salah Uddin Ahmed Jewel

source: https://www.facebook.com/100011467223962/posts/2331085307283687/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

ইচ্ছে কথা

রমা চক্রবর্তী দেবনাথ। 


সীমানা জুড়ে পাঁচিল তুলেছো

উঠোন করেছো আঁটো ।
বাইরে রেখেছো ইয়া বড়ো গেট
মনের দরজা খাটো ।
যতদিন ছিলো হাঁড়িগুলো বড়ো
পিসি কাকা কাকিমাতে ,
হাসিতে গল্পে দিন কেটে যেতো
ঝোলে ঝালে আলু ভাতে ।
পাশাপাশি বাড়ি বোঝাই যেতো না
কার সীমা কত দূর ।
এ বাড়ির গান উঠোন পেরিয়ে
ও বাড়ি তুলতো সুর ।
এ বাড়ির গাছে ফুল ফল হলে
ও বাড়িতে যেতো আধা ।
হেঁসেলের ঘরে চিনি কম হলে
চেয়ে আনা ছিলো বাঁধা ।
এ বাড়ির খুড়ো ও-বাড়ি চা খেতো
ও বাড়ির খুড়ো ভাত ।
এ বাড়িতে কোনো ঝামেলা মেটাতে
ও বাড়ি বাড়াতো হাত ।
আজকে সবার বড়ো বড়ো বাড়ি
পাঁচিলে লাগানো কাঁচ ।
এ বাড়ির কারো হৃদয় ভাঙলে
ও বাড়ি পায়না আঁচ ।
বড়ো বাড়ি আর ছোটো পরিবার
চেয়েছিলো বুঝি তারা ।
এ বাড়িতে কেউ মারা গেলে তাই
ও বাড়ি দেয়না সাড়া ।


আমেরিকান সিটিজেনশিপ দিয়ে আমি কী করব?

  এই জীবনে বেশির ভাগ কাজই আমি করেছি ঝোঁকের মাথায়। হঠাৎ একটা ইচ্ছে হলো, কোনো দিকে না তাকিয়ে ইচ্ছাটাকে সম্মান দিলাম। পরে যা হবার হবে। দু-এ...